ঢাকা সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২০, ০৩:৫৯ অপরাহ্ন

সমন্বয় হচ্ছে ভূতুড়ে বিল, ২৯০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদন
  • প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২০
ছবি: ঈশ্বরদীনিউজটুয়েন্টিফোর.নেট গ্রাফিক্স

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশজুড়ে অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের হাতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল ধরিয়ে দেওয়ায় ছয় বিতরণ সংস্থার ২৯০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে বিদ্যুতের যে ভূতুড়ে বিল গ্রাহকদের দেওয়া হয়েছিলো তা সমন্বয়ের কাজ চলছে। সে ক্ষেত্রে যেসব গ্রাহক ৩০ জুনের মধ্যে বিল পরিশোধ করতে পারেননি। তাদের জন্য সারচার্জ ছাড়া বিল পরিশোধে আরো সময় বাড়ানোর চিন্তা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

রোববার ( ৫ জুলাই) এ সংক্রান্ত ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন বিদ্যুৎ সচিব ড. সুলতান আহমেদ। তিনি বলেন, ‘যেসব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার মধ্যে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের মোট গ্রাহক সংখ্যা ২ কোটি ৯০ লাখ। এই কোম্পানিতে বাড়তি বিলের অভিযোগ পাওয়া গেছে ৩৪ হাজার ৬৮১ টি।’ প্রতিটি অভিযোগ বিশ্লেষণ করে বিল সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

‘অতিরিক্ত বিল কেন দেওয়া হয়েছে তার জন্য গঠিত মনিটরিং কমিটি সদস্য অর্থের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছে। যারা যেভাবে জড়িত আছেন তাদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে আরইবির নিজস্ব আইন এবং চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলেন সচিব।

সচিব জানান, ডিপিডিসি গ্রাহক সংখ্যা ৯ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৯ জন। বাড়তি বিলের অভিযোগ ১৫ হাজার ২৬৬টি পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত বিল কেন দেওয়া হয়েছে তা বিশ্লেষণ করে চারজন কর্মকর্তা কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। ৩৬ জন নির্বাহী প্রকৌশলীকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া ১৩ জন মিটার রিডার, রিডিং কালেকটর এবং একজন সুপারভাইজার মোট ১৪ জনের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। তাদের চুক্তি অনুযায়ি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান চাকমা বলেন, ‘গত বছরের এই সময়ে গ্রাহক কি পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে সে ধারণা থেকে এবার ম্যানুয়ালি বিল করতে গিয়ে সমস্যা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ৪ হাজার অভিযোগ পেয়েছি কিন্তু সমন্বয় করেছি ১৫ হাজার।’

বিতরণ সংস্থা ডেসকোর ১০ লাখ গ্রাহকের মধ্য থেকে ৫৬৫৭টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত বিলের কারণ খুঁজে বের করে কমিটি। এ ঘটনায় দুইজন মিটার রিডারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সাতজনকে মিটার রিডার ও একজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটরকে সতর্কপত্র দেওয়া হয়েছে।

বিতরণ সংস্থা নেসকো’র গ্রাহক ১৫ লাখ ৪৮ হাজার ৩৭৮ জন। বাড়তি বিলের অভিযোগ পাওয়া গেছে ২ হাজার ৫২৪টি। এ ঘটনায় দুইজন মিটার রিডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে শাস্তিস্বরূপ বদলি করা হয়েছে।

ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিশন কোম্পানি লিমিটেড- ওজোপাডিকো’র ১২ লাখ ১৩ হাজার গ্রাহকের মধ্যে অভিযোগ ৫৫৫ টি। অতিরিক্ত বিল করার অভিযোগে প্রাথমিকভাবে ২২৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী পরের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড
গ্রাহক সংখ্যা ৩২ লাখ ১৮ হাজার ৫১৫ জন। বাড়তি বিল দেওয়ার অভিযোগ এসেছে ২৫৮২ টি।

বিদ্যুৎ সচিব ড. সুলতান আহমেদ বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কারণে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার রিডিং করতে পারেনি। যার কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও পরে বিলের গড়মিল সমন্বয় ও সংশোধন করা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। যাদের হয়নি তাদের জুন মাসের বিলের সঙ্গে সমন্বয় করে দেওয়া হচ্ছে।’

কোনো অবস্থাতেই ব্যবহৃত বিদ্যুতের বেশি বিল কাউকে পরিশোধ করতে হবে না বলে উল্লেখ করেন বিদ্যুৎ সচিব। তিনি আরও বলেন, ‘এরপরেও যদি কারও অভিযোগ থাকে তবে আমাদের জানান। আমরা দ্রুত এর প্রতিকার করব।’

তিনি বলেন, ‘দেশজুড়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার ৬০১ জন কর্মকর্তা-কমর্চারী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ১২ জন মারা গেছে। কিছু গ্রাহকের বিল জটিলতায় এই নিরলস পরিশ্রম আজ সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এটি সম্পূর্ণরূপে অবহিত। সেভাবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কোম্পানিগুলো সেবার করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের ব্যবসা করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। অতিরিক্ত বিল প্রদানের সঙ্গে জড়িতদের গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখে বিভাগিয় শাস্তি ব্যবস্থা করা হবে এবং হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে চেষ্টা করেছি সকলকে বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে। আম্পানের সময়েও চেষ্টা করেছি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে সেজন্য গ্রাহকেদর কাছে দুঃখ প্রকাশ করি। আপনাদের আবার পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারব।’

তিনি আরও জানান, সারচার্জ ছাড়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের যে সময় সীমা ৩০ জুন পর্যন্ত ছিলো তা বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে। এতে করে একদিকে বিল সমন্বয় করার সময় পাওয়া যাবে। আবার গ্রাহককেও সারচার্জ দিতে হবেনা। তবে শিল্প ও বাণিজের ক্ষেত্রে সারচার্জ মাফ করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দিন দিন বাড়ছে এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে কোনো পদ্ধতিতে বিদ্যুত বিল তৈরি হবে সে প্রশ্নের জবাবে ডেসকো’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এরই মধ্যে জুন মাসের বিলআমরা শতভাগ মিটার রিডিং দেখে করেছি। ভবিষ্যতে দুর্যোগ হলেও ঝুঁকি নিয়ে হলেও করবো। স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করেই আমরা বিল করব বলে জানিয়েছেন নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে দেশজুড়ে লকডাউন ও সাধারণ ছুটি চলাকালে বিতরণ কোম্পানিগুলো যে বিদ্যুৎ বিল গ্রাহকদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে তা দেখে অধিকাংশেরই চোখ কপালে উঠে গেছে। একেকজনের স্বাভাবিক বিলের চেয়ে তিন থেকে দশ গুণ পর্যন্ত বাড়তি বিদ্যুৎ বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে গ্রাহকরা অভিযোগ করলে বিতরণ কোম্পানিগুলো আমলে না নেওয়ায় গত ২৫ জুন বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব প্রশাসন এবং অতিরিক্ত সচিব সমন্বয় কে প্রধান করে দুটি টাস্কফোর্স গঠন করে দেয় বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২০
 
themebaishwardin3435666