ঢাকা বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ন

২৪ ঘণ্টা পরও ‘হোপ-হোপ, আড়িয়া-আড়িয়া, হাপেজ হাপেজ’

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই, ২০১৯
ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহীগামী ফারনেস তেলবাহী ওয়াগনের আটটটি বগি লাইনচ্যুত হয়। ছবি: শহীদুল ইসলাম

‘হোপ-হোপ, আড়িয়া-আড়িয়া, হাপেজ-হাপেজ অপরিচিত এই শব্দগুলো এক রাত একদিন ধরে শুনেছেন রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার দিঘলকান্দি গ্রামের মানুষ। এই শব্দগুলো লাইনচ্যুত ট্রেনের বগি উদ্ধারকারী ক্রেনচালক ও কর্মীদের সাংকেতিক ভাষা। হোপ মানে থামাও, আড়িয়া মানে উঠাও আর হাপেজ মানে ওপরে তোল।

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদহ স্টেশন ছেড়ে পুঠিয়ার দিঘলকান্দি এলাকায় এসে বুধবার (১০ জুলাই) সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহীগামী ফারনেস তেলবাহী ওয়াগনের আটটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এই ওয়াগনে মোট ৩১টি বগি ছিল। রাজশাহীর কাটাখালী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য এই ফারনেস তেল আনা হচ্ছিল। লাইনচ্যুত হওয়ার পরে বগি উল্টে না যাওয়ার কারণে কোনো বগির তেল পড়ে যায়নি।

লাইনচ্যুত তেলবাহী ওয়াগনের আটটি বগি ওঠাতেই প্রায় প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে।

এর মধ্যে রাজশাহী থেকে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী ট্রেনের প্রায় ৭ হাজার যাত্রীর ২৬ লাখ টাকার টিকিট ফেরত দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে যাত্রীরা পড়েছেন সীমাহীন দুর্ভোগে। অনেকেই লোকাল বাসে উঠে বসেছেন। কর্তৃপক্ষ মনে করছেন রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার এই ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ জন্য পশ্চিম রেলওয়ের একজন সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর ঈশ্বরদী থেকে উদ্ধারকারী ক্রেন এসে রাত আটটা ৪০ মিনিটে কাজ শুরু করে। তখন থেকে ক্রেনচালক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা মিলে প্রায় ২০০ জন মানুষ সারা রাত-সারা দিন ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থেকে উদ্ধার কাজ করছেন।

ঘটনার পরই কর্তৃপক্ষ ঘটনার জন্য পশ্চিম রেলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রশিদকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছেন। ঘটনার তদন্তের জন্য বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আরিফুল ইসলামকে সভাপতি করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তার ঘটনার পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) খন্দকার শহিদুল ইসলাম বলেন, রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার জন্যই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই এলাকাটি প্রকৌশলী আব্দুর রশিদের দায়িত্বে ছিল। তদন্ত শেষে এই দুর্ঘটনার জন্য আরও কে কে দায়ী হতে পারে তা আরও সুনির্দিষ্ট হবে। তখন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় লোকজনের ধারণা, রেললাইনের ওপর দিয়ে একটি নতুন রাস্তার কাজ হয়েছে। এ জন্য লাইনের ওপর দিয়ে ভারী ট্রাক চলাচল করেছে। লাইন কিছুটা দেবে গেছে। এরই মধ্যে ভারী বৃষ্টি হয়েছে। আর রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা রয়েছে । সব মিলিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রাজশাহীর রেলওয়ে স্টেশনের প্রধান বুকিং কর্মকর্তা আবদুল মমিন জানিয়েছেন গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত ৭ হাজার যাত্রীর ২৬ লাখ টাকারও বেশি টিকিটের মূল্য ফেরত দেওয়া হয়েছে।
মমিন জানান, গতকাল বুধবার রাতের ঢাকাগামী ট্রেনসহ মোট ৮টি ট্রেনের রাজশাহীর যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এসব ট্রেনের মধ্যে রয়েছে ধূমকেতু এক্সপ্রেস, তিতুমীর এক্সপ্রেস, সাগরদাঁড়ি, কপোতাক্ষ, বরেন্দ্র এক্সপ্রেস, মধুমতি এক্সপ্রেস, বনলতা এক্সপ্রেস, সিল্কসিটি ও টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রীদের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিকল্প পন্থায় রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ চালু রেখেছে রেল কর্তৃপক্ষ। ঢাকা অভিমুখী সকল ট্রেন ঈশ্বরদী থেকে এবং অন্যান্য ট্রেন নাটোর থেকে ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে করে বনলতা ও ধূমকেতু এক্সপ্রেস ছাড়া অন্য ট্রেনগুলো রাজশাহী না ঢুকে ফিরে গেছে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বগিগুলো শুধু লাইনচ্যুতই হয়নি। রীতিমতো লাইন ভেঙেও গেছে। বিকেল পাঁচটার দিকে ছয়টি বগি লাইনের ওপরে তোলার কাজ চলছিল।

মাঠের মধ্যে একটি লেভেল ক্রসিংয়ের ওপরে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। লাইনে উত্তর পাশে গভীর খাত। দক্ষিণপাশেও পাটখেত। শত শত মানুষ লাইনের দুই পাশে দাঁড়িয়ে এই উদ্ধার কাজ দেখছেন।

চারঘাটের হলিদাগাছি গ্রামের রাজমিস্ত্রি রাব্বি ইসলাম (২০) বললেন, রেলের কর্মীদের ‘হোপ-হোপ-শুনতে শুনতে রাত পোহায়ে সকাল হলো। সারাদিন গেল আবারও রাত আসছে বগি তোলা শেষ হচ্ছে না। খালি শুনছিই হোপ-হোপ, আড়িয়া-আড়িয়া। এর মানে কী ওরাই বলছে, ওরাই বুঝছে।’ দেখা যায়, রেলওয়ে পুলিশের বাঁশি উপেক্ষা করে সাধারণ লোকজন মুঠোফোনে উদ্ধারকাজের দৃশ্য ধারণ করছেন। সেখানে মহাব্যবস্থাপক, প্রধান প্রকৌশলী আফজাল হোসেন, প্রধান সংকেত ও টেলিকম প্রকৌশলী অসীম তালুকদারসহ ১৫ জন কর্মকর্তা ও প্রায় ২০০ জন কর্মী উদ্ধার কাজ করছেন। তখনই প্রধান প্রকৌশলী আফজাল হোসেন বলেন, বগি তোলার পর লাইন মেরামত করে দেরি হলেও তারা পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেন ছাড়বেন।

এদিকে এ ঘটনায় যাত্রীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে চড়ছেন লোকাল বাসে। রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন পরিচালিত বাস চেকপোস্ট মাস্টারের তথ্য মতে সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ১৯টি লোকাল বাস ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। সবগুলোই ভর্তি ছিল। অন্য দিনের তুলনায় লোকাল বাসের চাপ একটু বেশি।
মেহেদী হাসান নামের একজন যাত্রী সোনামসজিদ থেকে তাঁর বাবা ও মাকে নিয়ে হজ্জ ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য এসেছেন। এসে দেখেন বিকালের ট্রেনের যাত্রা অনিশ্চিত। বাসেরও টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় চরম বিপাকে পড়েছে এই পরিবার। শেষ পর্যন্ত তারা ট্রেনের অপেক্ষায় স্টেশনে বসে রয়েছেন।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
%d bloggers like this: