ঢাকা সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০১:৪৩ অপরাহ্ন

স্যার, কী শহর কী হইল

ঢাকা প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত: বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২০
কর্মদিবসেও ঢাকার রাস্তা প্রায় ফাঁকা। মালিবাগ, ঢাকা, ১৮ মার্চ।

ঢাকার এই আবহাওয়া একেবারেই অচেনা। চৈত্র মাস এসে গেল, অথচ ভোরের হিমেল ভাবটা গেল না। এখনো যেন শীত শীত আমেজ। রাস্তায় বেরোলে এ নগর আরও অচেনা। এত মানুষ বাস, তারা গেল কই? পথচারী কম, যানবাহনও হাতে গোনা। সাতসকালে বেরিয়ে একটা রিকশা নিই। রিকশাচালক আমার অফিসের দিকে প্যাডেল মারতে মারতে বলেন, ‘দেখিছেন স্যার, কী শহর কী হইল!’

আমি বলি, ‘কী হইল?’
‘মানুষজন সব হারায় গেছে।’
‘হারাবে না? করোনা বলে কথা! একবার ধরলে উপায় আছে?’
‘আমাগের এসব ধইরলে চলে না, স্যার। প্যাটের দায়। করোনায় কী করবে? কাজকাম কম থাইকলে তো এমনেই না খাইয়ে মরতে হবে।’
রিকশাচালকের নাম শাহীন মিয়া। বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। বয়স হলেও দিব্যি সুঠাম শরীর। বাড়ি নাটোরের লালপুরে। জানালেন, স্কুলগুলো বন্ধ হওয়ায় এখন খ্যাপ কমে গেছে। আগে যেখানে রিকশার মালিককে দিয়ে-থুয়ে রোজ গড়ে ৫০০ টাকা থাকত, এখন তা ৩০০ টাকায় নেমে এসেছে। ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, আরও নেমে যাবে আয়। তাই তাঁরা লালপুরের যে কজন একসঙ্গে আছেন, সবাই কাল বৃহস্পতিবারই বাড়ি ফিরে যাবেন। সেখানে আখখেতে কাজ করবেন। স্থানীয় সরকারি চিনিকলে আখের বেশ চাহিদা। তাই লালপুরে আখ চাষ বেশ জনপ্রিয়। রোজ সকাল সাতটা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত খেতে মজুরি খাটলে খাওয়াসহ জোটে ৩০০ টাকা। ঢাকায়ও সেই একই আয়। এখানে বরং থাকা-খাওয়ার খরচ বেশি। তাই আপাতত বাড়ি ফিরে যাওয়াই ভালো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফিরে আসবেন।

কথায় কথায় শাহীন মিয়া জানালেন ঢাকা শহরের প্রতি তাঁর দুর্নিবার টানের কথা। সেই ২০০১ সাল থেকে ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছেন তিনি। ভূমিহীন বাবার এই সন্তান রিকশা চালিয়েই লালপুরের গ্রামে ৪ শতাংশ জমি কিনেছেন। সেখানে ঘর তুলে পেতেছেন সংসার। আছে তিন ছেলেমেয়ে।

শাহীন মিয়ার সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, করোনার ভয়ে নয়, গ্রামে ফিরছেন জীবিকার তাগিদে। একমাত্র ছেলে পড়াশোনা করে। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে, আরেকটাকে দিতে হবে। খরচখরচার ব্যাপার আছে। তবে তাঁর এই ফিরে যাওয়ার মধ্যে করোনার প্রভাব তো আছেই। এ ভাইরাস থেকে সতর্ক থাকতেই তো সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ।

গতকাল মঙ্গলবার কারওয়ান বাজারে সবজি কেনার সময় পরিচিত পেঁয়াজ বিক্রেতা বলেন, ‘পেঁয়াজ নেন, স্যার।’
বললাম, ‘মাত্র সেদিন না নিলাম!’
‘গিরামে চলে যাচ্ছি, স্যার। এই শ্যাষ।’
‘কেন?’
‘দ্যাখেন না, কাস্টমার কম। বেইচা সুবিধা হয় না। বেবাকে করুনার ভয়ে ঘরে ঢুকছে।’
‘আপনার ভয় নেই?’
‘এইগুলারে আমরা ডরাই না। মৃত্যু আইলে তো যহন-তহন হইতে পারে। করুনায় কী করব?’

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে এত অল্পেই অধৈর্য হলে চলবে না। নিম্নশ্রেণির মানুষ, যাঁরা সংবাদমাধ্যম বা বিশ্বের খবরাখবর তেমন রাখেন না, তাঁদের মধ্যে এ ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা কম। আর স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা তো আরও কম। খেটে খাওয়া অনেকেই হাত না ধুয়েই খেতে বসে যান। খাওয়া শেষে কিছু একটা দিয়ে হাত মুছেই খালাস। তাঁদের একেবারে চোখ আঙুল দিয়ে করোনাভাইরাসের সচেতনতা সম্পর্কে সতর্ক করা দরকার।

আমাদের দেশে যখন কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা কোনো রোগের কারণে মহামারি দেখা দেয়, তখন অনেক সময় হুজুগ আর গুজব পরিস্থিতি গুরুতর করে তোলে। আজই খবর পেলাম, বরিশালের গৌরনদী, আগৈলঝাড়া ও উজিরপুর উপজেলায় গতকাল গভীর রাতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তিনটি থানকুনিপাতা খেলে করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। তবে ফজরের নামাজের আগেই এ পাতা খেতে হবে। এ গুজব খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গতকাল দিবাগত রাত দুইটা থেকে ফজর নামাজের আগপর্যন্ত পাতা খাওয়ার হিড়িক চলে। কোথাও কোথাও থানকুনিপাতা খেতে মাইকে আহ্বান জানানো হয়।

প্রথম আলোর অনলাইনে প্রকাশিত এ–বিষয়ক খবরে উল্লেখ রয়েছে, উজিরপুর উপজেলার সখিনা বেগম (৬০) ও হাবিব সরদার (৪৮) বলেন, ‘রাইতে মোগো আত্মীয়রা জানাইছে, তিনডা থানকুনিপাতা খাইলে আর করোনা অইবে না। হেইয়ার লাইগ্গা মোরা রাইতে পাতা খাইছি। হগ্গলডিরে পাতা খাইতেও কইছি।’

সত্যাসত্য যাচাই না করে গুজবে কান দেওয়ার পরিণতি ভয়াবহ। কিছুদিন আগে ‘ছেলেধরা’ গুজবের পরিণতি আমরা সভয়ে স্মরণ করতে পারি। এ থেকে শিক্ষা নেওয়াও আবশ্যক।

১৯৮৭ সালে আচমকা দেশজুড়ে একটা গুজব ছড়িয়ে ছিল যে ঢোলকলমিগাছ নাকি খুব বিষাক্ত। এটার পাতা থেকে বিষক্রিয়ায় মানুষ মারা যায়। পরে শোনা গেল, ওই গাছের পাতার আড়ালে একটা পোকা থাকে। সেটাই মৃত্যুর কারণ। এ নিয়ে পত্রপত্রিকা সরগরম। পরে টিভিতে প্রচারিত অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন যে এই পোকা হাতে নিলে কিছুই হয় না। যা রটেছে, স্রেফ গুজব। কাজেই করোনা নিয়ে যেকোনো গুজব থেকে সাবধান!

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
%d bloggers like this: