ঢাকা সোমবার, ১৪ জুন ২০২১, ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন

সরব হচ্ছে আমের রাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১ জুন, ২০২১
দেশের সবচেয়ে বড় আমবাজার চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট আমবাজার আবার জমতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। ছবি: ঈশ্বরদী নিউজ টুয়েন্টিফোর

দেশের সবচেয়ে বড় আমবাজার চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট আমবাজার। গত শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকেও সেখানে গিয়ে খাঁ খাঁ অবস্থা দেখা যায়। আমশূন্য সেই বাজারের চার দিন বাদেই পুরো উল্টো চিত্র। আজ মঙ্গলবার শতাধিক আমবোঝাই রিকশাভ্যানে করে জমজমাট বেচাবিক্রি দেখা যায় সেখানে। লকডাউনের কারণে যে হতাশা গ্রাস করেছিল আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের, এই বেচাবিক্রিতে যেন তা দূর হতে শুরু করেছে।

দুপুরে কানসাট আমবাজারে দেখা যায়, আমবোঝাই ভ্যানের যেন হুড়োহুড়ি লেগেছে। শিবগঞ্জ থেকে যাওয়ার পথে কানসাটের যেখান থেকে শুরু হয়েছে আমের আড়ত, সেখানকার একটি আড়তের সামনে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি আমবোঝাই ভ্যান ঢুকছে আড়তের মধ্যে। আড়তের নাম রনি ফলভান্ডার। মালিক মো. ফারুক হোসেন আজকের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, গতকাল সোমবার থেকেই বাজার সরব হতে শুরু করেছে। তবে গতকালের চেয়ে আজ ভিড় একটু বেশি। যদিও বিক্রেতার সংখ্যার অনুপাতে ক্রেতা একটু কম। বাজারে আজই প্রথম নেমেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত ক্ষীরশাপাতি আম।

বাজারের পূর্ব প্রান্তে ঢোকার মুখেই ভ্যানের ওপর চার ডালি ডাঁসা ডাঁসা ক্ষীরশাপাতি আম নিয়ে বিক্রির অপেক্ষা করছিলেন শিবগঞ্জের চককীর্তি ইউনিয়নের মুকিমপুর গ্রামের আমচাষি একরামুল হক (৪২)। দর-কষাকষি চলছিল রাজশাহীর বাঘা উপজেলা থেকে আসা আম ব্যবসায়ী মো. বাচ্চুর সঙ্গে। মো. বাচ্চু আমের দর ১ হাজার ৫০০ থেকে শুরু করে ১ হাজার ৬৫০ টাকা হেঁকে থামলেন। আমচাষি একরামুল সাফ জানিয়ে দিলেন, তিনি এই আম ২ হাজার টাকা মণের নিচে ছাড়বেন না। এমন ক্ষীরশাপাতি আম নিয়ে আশপাশেও ছিল আরও কয়েকটি ভ্যান। তাঁদেরও ওই এক কথা, ২ হাজারের নিচে বেচবেন না।

পাশেই ছিলেন তরুণ আম বিক্রেতা সিফাত মো. ফরিদুজ্জামান। তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন গোপালভোগ আম নিয়ে। শিক্ষিত এই তরুণ বলেন, ‘গোপালভোগ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভালো জাতগুলোর একটি। কিন্তু এবার লকডাউনের কারণে খুব ভালো দাম পাওয়া যায়নি। যদিও গোপালভোগের এখন শেষ সময় চলছে। গতকালও আমি এ আম বাজারে নিয়ে এসেছিলাম। বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে। অথচ আজ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা দরে।’

আমবাজার ভবনের আড়তদার আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সংখ্যায় কম হলেও জেলায় বাইরের ব্যাপারী আসতে শুরু করেছেন। আমার ঘরে পাঁচজন ব্যাপারী। এর মধ্যে তিনজন ঢাকা ও দুজন ফরিদপুরের।’ এ ভবনে আমের আড়ত মিম এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুর রব বলেন, ‘এ লকডাউনের মধ্যে কানসাট বাজারে গতকাল থেকে আম নামছে ভালোই। বাজারের নীরবতা ভাঙতে শুরু করেছে। আমাদের মনে যে হতাশা বিরাজ করছিল, তা একটু একটু করে দূর হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, বিভিন্ন আড়তেই একজন বা দুজন করে বাইরের ব্যাপারী আসা শুরু করেছেন। তবে এখনো অনলাইনেই আম বিক্রি হচ্ছে বেশি। মোবাইলে অর্ডার আসছে।’

কানসাট-সোনামসজিদ সড়কের পাশে আমের আড়ত স্বর্ণা এন্টারপ্রাইজ। শুক্রবার এখানে এসে দেখা যায়, মাত্র দুই ভ্যান আম কিনেছিলেন আড়তের মালিক হাসান আলী। আজ তিনি কিনেছেন ১২ ভ্যান আম। তাঁর আড়তে কাজ করছেন ছয়জন শ্রমিক। শ্রমিকদের মধ্যে মোবারকপুর ইউনিয়নের টিকরি গ্রামের রবিউল আওয়াল বলেন, তিন-চার দিন আগেও দৈনিক আয় ছিল ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। আজ আয় হতে পারে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মতো। আমের মৌসুমে হাজার হাজার শ্রমিক চার মাস কাজ করেন। মৌসুমে কারও কারও ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। এ টাকা দিয়ে তাঁরা ঋণ শোধ করেন, গরু-বাছুর কেনেন, বাড়িঘর মেরামত করেন, ছেলেমেয়েদের বিয়েতে খরচ করেন।

মুঠোফোনে কথা হয় কানসাট আম আড়তদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কানসাটে আড়তদারদের সমিতি রয়েছে তিনটি। এ সমিতিগুলোর অধীনে রয়েছে প্রায় ৬০০ আড়ত। গতকাল ও আজ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আড়ত ব্যবসা শুরু করেছে। আমের ভরমৌসুম শুরু হওয়ার আগে এ অবস্থা মোটামুটি আশাব্যঞ্জক। লকডাউনের মধ্যে যে হতাশা ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল, আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের মনে তা কিছুটা হলেও দূর হয়েছে। বিষয়টি আমাদের কাছে স্বস্তিদায়ক।’

শিবগঞ্জ ম্যাঙ্গো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক শামীম খান বলেন, ‘অনলাইনে বেচাবিক্রি শুরু হয়েছে ভালোই। বহু তরুণ-যুবক অনলাইনে আম বিক্রি করছেন। আম বিক্রির জন্য আমাদেরও অনলাইনভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। এ প্ল্যাটফর্মের সদস্যদের কার বাগানে কী কী জাতের আম রয়েছে, তা আমরা তালিকাভুক্ত করছি। আজকেই আমি অনলাইনে ১ হাজার ৫০০ কেজি আমের অর্ডার পেয়েছি। আমের বাজার সরব হতে শুরু করেছে। আমাদের কাছে এটা অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। এ ছাড়া জেলায় চলমান লকডাউনে বাইরে থেকে আসা আম ব্যাপারীদের জেলায় ঢুকতে দিতে বাধা দেওয়া হবে না বলে জেলা প্রশাসক যে ঘোষণা দিয়েছেন, এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা চাই, চাঁপাইনবাবগঞ্জের হাজার কোটি টাকার আম ব্যবসায় সরকার সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।’

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666