ঢাকা বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ০৫:৪৬ অপরাহ্ন

পঁচিশোর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ৩৭ শতাংশ নিরক্ষর রেখে বন্ধ বয়স্ক শিক্ষা

বার্তা কক্ষ
  • প্রকাশিত: রবিবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২০
গোটা শ্রমশক্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখনো অক্ষরজ্ঞানহীন।

দেশে ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ৩৭ শতাংশই নিরক্ষর। অর্থাৎ গোটা শ্রমশক্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখনো অক্ষরজ্ঞানহীন। অন্যদিকে এ নিরক্ষরতাকেই আবার দায়ী করা হয় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের কারণ হিসেবে। তার পরও পঁচিশোর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ নিরক্ষর রেখেই প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) অনুযায়ী, একটি সহজ চিঠি লিখতে পারলে কোনো ব্যক্তিকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বলা যাবে। বিবিএস প্রকাশিত বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০১৮ অনুযায়ী, দেশের ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৬৩ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষদের সাক্ষরতার হার ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ ও নারীদের মধ্যে এ হার ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এ হিসাবে দেশে ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সের মোট জনগোষ্ঠীর ৩৭ শতাংশ নিরক্ষর।

পঁচিশোর্ধ্ব কর্মক্ষম এ জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতার আওতায় আনতে নেয়া হচ্ছে না পর্যাপ্ত বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম। গত দুই দশকে দেশে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমে মাত্র একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। সে প্রকল্পটির এখনো বাস্তবায়ন শেষ হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে গত দুই দশকে বয়স্ক শিক্ষার ক্ষেত্রে তেমন কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলনের পর বড় কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অধিদপ্তর বাতিল করার পর কয়েক বছর কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এরপর ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের (বিএলপি) ডিপিপি করা হয়। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে এটি অনুমোদন পায়। এরপর চার বছর তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ধাপের কার্যক্রম শেষ করি। এখন আগামী মার্চ থেকে দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু হবে। এখন বড় একটি প্রোগ্রাম প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি অনুমোদন পেলে বড় পরিবর্তন আসবে।’

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার অন্যতম প্রকল্প সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলন (টিএলএম) শুরু হয় ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত এ প্রকল্পটি নানা অভিযোগে ব্যর্থ হয়। এছাড়া ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে দুর্নীতির অভিযোগে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরই বন্ধ করে দেয়া হয়। সে সময় বেসরকারি সংস্থা নির্বাচনে অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে আবার উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো নামে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার কার্যক্রম শুরু হয়। এ ব্যুরোর অধীনে মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (বিএলপি) অনুমোদিত হয় ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে। এ প্রকল্পের বাস্তবায়নের সময়সীমা ছিল ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটির একটি ধাপ সম্পন্ন হলেও, এখনো একটি ধাপ অবাস্তবায়িত রয়েছে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, সাক্ষরতার হার ও সংজ্ঞায়ন নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এখন আমরা যদি সরকারের হিসাবটাকেই গ্রহণ করি, এর পরও ২৫ শতাংশেরও অধিক জনগোষ্ঠী নিরক্ষর থেকে যাচ্ছে। এ সংখ্যাটা কিন্তু কম নয়। ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরক্ষরতার হার আরো অনেক বেশি। এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতার আওতায় নিয়ে আসতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। দেশে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে বয়স্কদের শিক্ষার বড় কোনো উদ্যোগ নেই। সরকার যখন সার্বিক সাক্ষরতা কর্মসূচি নিল, তখন প্রজ্ঞাপন দিয়ে এনজিওগুলোকে বয়স্ক শিক্ষার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হলো। এরপর সে প্রকল্পে লুটপাটের অভিযোগে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর বন্ধ হলো। এরপর সরকারি-বেসরকারি কোনো খাত থেকেই বড় উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সরকারি নানা উদ্যোগের সুফল মেলে না। যেমন বয়স্ক শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রমগুলোয় বয়স্করা আগ্রহী হন না। তারা বুড়ো বয়সে কাজ ফেলে পড়তে আসতে চান না। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বয়স্ক শিক্ষার প্রকল্পে বিভিন্ন দক্ষতামূলক কর্মসূচি যোগ করে দেয়া হয়, যাতে তারা আগ্রহী হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ করা যেতে পারে। সরকারের উচিত শুধু প্রকল্পভিত্তিক না করে, সঠিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে কর্মসূচি গ্রহণ করা।

বিবিএসের বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সার্বিক সাক্ষরতার হার ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ। ১৫ বছরের বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষদের ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ ও নারীদের ৭০ দশমিক ১ শতাংশ।

এছাড়া অঞ্চলভেদেও সাক্ষরতার হারে পার্থক্য রয়েছে। বিবিএসের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি সাক্ষরতার হার বরিশালে। অঞ্চলটির জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮২ দশমিক ৩ শতাংশ। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা। এ অঞ্চলে সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রামে সাক্ষরতার হার ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ। সাক্ষরতার হারে সবচেয়ে পিছিয়ে রংপুর। অঞ্চলটিতে সাক্ষরতার হার ৭০ শতাংশ। এর বাইরে সাক্ষরতার হার সিলেটে ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ, ঢাকায় ৭০ দশমিক ৫ ও রাজশাহীতে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।

সাক্ষরতার হারের দিক থেকে শহর ও গ্রামাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বড় ব্যবধান রয়েছে। দেশের শহরাঞ্চলে সাক্ষরতার হার ৮১ দশমিক ১ হলেও গ্রামাঞ্চলে এ হার মাত্র ৬৬ দশমিক ১ শতাংশ।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
error: © স্বত্ব ঈশ্বরদী নিউজ টুয়েন্টিফোর