ঢাকা শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৩:০৬ অপরাহ্ন

নয় মাস ধরে বন্ধ ১ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
অভাবের তাড়নায় ঝরে পড়া খুদে শিক্ষার্থী রোধে উদ্যোগ নেওয়া হয় উপবৃত্তির | ছবি- সংগৃহীত

মহামারি করোনার কারণে টানা নয় মাস ধরে বন্ধ প্রাথমিকের এক কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি। পাশাপাশি আটকে গেছে নতুন বছরে বইয়ের সঙ্গে জামা, জুতা ও ব্যাগ কেনার এককালীন এক হাজার টাকাও। উপবৃত্তি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান বদল এবং অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থছাড় না করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে, করোনা মহামারির মধ্যে উপবৃত্তির টাকা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা। পড়ালেখা থেকে অনেক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ারও আশঙ্কা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপবৃত্তি প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০২০ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। গেল বছরের আরও তিনটি কিস্তি এপ্রিল-জুন, জুলাই-সেপ্টেম্বর, অক্টোবর-ডিসেম্বরের টাকা আটকে আছে। নতুন বছরের প্রথম মাসের (জানুয়ারি) মাঝামাঝি সময় পার হলেও বকেয়া নয় মাসের উপবৃত্তির টাকা কবে বা কখন দেওয়া হবে, সুনির্দিষ্ট করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২০ সালের এপ্রিল-জুন মাসের অর্থছাড়ের চেষ্টা চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয় টাকা ছাড়ে গড়িমসি করায় সেটাও দেরি হচ্ছে। জুলাই-আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর, এ দুই কিস্তির টাকা কবে পাওয়া যাবে তারও নিশ্চয়তা নেই।

এছাড়া অর্থের অভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতি, নতুন বইয়ের সঙ্গে জামা, জুতা ও ব্যাগ কেনার জন্য শিক্ষার্থীদের এককালীন এক হাজার টাকার কিট অ্যালাউন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াও আটকে গেছে। এ বছর প্রকল্প বাস্তবায়নে ১১শ’ কোটি টাকা চেয়ে কয়েক দফা চিঠি দিয়েও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাড়া মিলছে না। ফলে নতুন বই পেলেও শিক্ষার্থীরা এককালীন টাকা পাবে কি-না, তাও এখন অনিশ্চিত।

জানা গেছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্পের (তৃতীয় পর্যায়) মেয়াদ শেষ হয়। এরপর আরও এক বছরের জন্য প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এর মধ্যে গত ডিসেম্বর মাসে উপবৃত্তি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। রূপালী ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং ‘শিওরক্যাশ’ বদলে ডাক বিভাগের মোবাইল লেনদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’কে এ কাজ দেওয়া হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, এতদিন উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের নতুন করে ‘নগদ’-এর সার্ভারে ডাটা এন্ট্রি করতে হচ্ছে। এতে দুই দফা সময় দিয়েও ৬৫ হাজার স্কুলের মধ্যে শুক্রবার (১৫ জানুয়ারি) পর্যন্ত মাত্র পাঁচ হাজারের মতো প্রতিষ্ঠানের ডাটা এন্ট্রি করাতে পেরেছে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। কবে নাগাদ এন্ট্রির কাজ শেষ হবে তাও নিশ্চিত নয়। অর্থাৎ ডাটা এন্ট্রির কাজ শেষ না হলে উপবৃত্তির অর্থ বিতরণ সম্ভব হবে না।

এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রদান’ প্রকল্পের পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ইউসুফ আলী শুক্রবার বিকেলে বলেন, ২০২০ সালের এপ্রিল-জুন মাসের কিস্তির টাকা ছাড়ের চেষ্টা করছি। অর্থ মন্ত্রণালয় টাকা ছাড় করা মাত্রই তা বিতরণে আমরা প্রস্তুত। তবে পরের কিস্তির টাকা কবে বিতরণ হবে তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করছে।

তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আগামী সপ্তাহে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে এককালীন এক হাজার টাকাসহ বাকি কিস্তির টাকা চাওয়া হবে।

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ  বলেন, অভিভাবকরা প্রায়ই আমাদের কাছে জানতে চান, উপবৃত্তির টাকা কবে পাবে। কোনো উত্তর দিতে পারি না। উপবৃত্তির টাকা দেওয়ায় ছাত্র-ছাত্রী ঝরে পড়ার হার যেমন কমেছে, তেমনি এ টাকা সময়মতো না দিলে সেই হার বেড়ে যাবে।

নতুন বই পেলেও মেলেনি জুতা-জামা-ব্যাগের টাকা

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এর মধ্যে এক কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। বছরের প্রথম দিন নতুন বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। নতুন বইয়ের সঙ্গে ২০২১ সালে তাদের জামা, জুতা ও ব্যাগ কেনার জন্য এক হাজার টাকার কিট অ্যালাউন্সও দেওয়া হবে।

তবে বছরের (২০২১) প্রথম দিনে নতুন বই তুলে দিলেও শিক্ষার্থীদের হাতে এককালীন অর্থ তুলে দিতে পারেনি সরকার। কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থছাড় না দেওয়ায় বইয়ের সঙ্গে টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বছর দুই দফায় এককালীন টাকার (১১শ’ কোটি টাকা) জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। কিন্তু এতে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত উপবৃত্তির টাকা চাওয়ার পরও মিলছে না। এর মধ্যে কিট অ্যালাউন্স দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এদিকে আগামী সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রাথমিক মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত বাজেট নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে এককালীন অর্থছাড়ের বিষয়টি উঠানো হবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক ইউসুফ আলী। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের এককালীন টাকা দেওয়া হবে বলে ফের দেশবাসীকে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থ মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি ফের মনে করিয়ে দেব।

ভোগান্তির নেপথ্যে জন্ম নিবন্ধন

গত ১৩ ডিসেম্বর প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি বিতরণের জন্য সার্ভিস চার্জ দশমিক ৭৫ পয়সা ধরে ‘নগদ’-এর সঙ্গে চুক্তি করে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্প। চুক্তি অনুযায়ী, জিটুপি (সরকার টু পাবলিক) পদ্ধতিতে উপবৃত্তি টাকা বিতরণ করবে নগদ। চুক্তিতে উপবৃত্তির সুবিধাভোগী অর্থাৎ শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন এবং শিক্ষার্থীর মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে ডাটা এন্ট্রি করা বাধ্যতামূলক করা হয়।

২৮ ডিসেম্বর থেকে ডাটা এন্ট্রির কাজ শুরুর পর নানা জটিলতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে শিক্ষকদের। এর মধ্যে অন্যতম হলো- স্কুলে শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন না থাকা। ভর্তির সময় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন না নেওয়া, অভিভাবকদের কাছে সন্তানের জন্ম নিবন্ধন না থাকা। অনেকেই আবার ইউনিয়ন পরিষদ বা ওয়ার্ডে জন্ম নিবন্ধন আনতে গিয়ে পড়েন সার্ভার জটিলতায়।

এর সঙ্গে নগদ-এর সার্ভারে সমস্যা, মফস্বল এলাকায় ইন্টারনেটের ধীরগতি, মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকাসহ শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের খুঁজে না পাওয়ার কারণে ডাটা এন্ট্রির কাজ চলছে কচ্ছপগতিতে।

রাজধানীর ভাসানটেক স্কুলের শিক্ষক জলিল মণ্ডল বলেন, ডাটা এন্ট্রি করতে গিয়ে রীতিমতো পাগল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা! ভর্তির সময় অনেক শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন নেওয়া হয়নি। অনেকের জন্ম নিবন্ধন খুঁজেও পাচ্ছি না। অভিভাবকদের কাছে চাইলে অনেকেই বলছেন নেই। প্রথমদিকে নগদ-এর সার্ভারে সমস্যা ছিল। এ কারণে তারাও ডাটা এন্ট্রি দিতে পারেনি।

উপবৃত্তি প্রকল্পের তথ্য অনযায়ী, প্রথম দফা সময় বাড়ানোর পর গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ৬৫ হাজার স্কুলের মধ্যে মাত্র পাঁচ হাজার ১০৬টি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ডাটা এন্ট্রি করেছে। আগামী রোববার (১৭ জানুয়ারি) এর বর্ধিত সময় শেষ হবে।

এরপর কি আবার সময় বাড়ানো হবে— এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রকল্প পরিচালক মো. ইউসুফ আলী বলেন, আগামী রোববার পর্যন্ত সময় আছে। এর মধ্যে আরও প্রতিষ্ঠান এন্ট্রির কাজ শেষ করতে পারবে। কারণ অনেকেই ৭০ থেকে ৮০ ভাগ শিক্ষার্থীর তথ্য এন্ট্রি করেছে। বাকিগুলো করলে তারাও সম্পূর্ণ হালনাগাদ তথ্যের মধ্যে চলে আসবে। এরপর কত প্রতিষ্ঠান বাকি থাকে তা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

শিক্ষকরা জানান, নগদ-এর সার্ভারে শিক্ষার্থীদের মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে কেনা সিম থেকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। তা না হলে নগদ ডাটা এন্ট্রি নিচ্ছে না। এতে অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন।

দেশে প্রাথমিকপর্যায়ের শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য ১৯৯৯ সালে উপবৃত্তি প্রকল্প শুরু হয়। প্রকল্পের তৃতীয় মেয়াদ শেষে বর্তমানে ‘বিশেষ বছর’ চলছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে প্রাক-প্রাথমিক ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংযুক্তি প্রাথমিক স্তর, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত প্রাথমিক স্কুল, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু করা সরকারি প্রাথমিক স্কুল, সরকারের স্বীকৃতি পাওয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা ও হাই মাদরাসার শিক্ষার্থীরা এ বৃত্তি পেয়ে থাকেন।

শ্রেণিভেদে শিক্ষার্থীদের ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা (চার শিক্ষার্থীর পরিবার) পর্যন্ত উপবৃত্তি দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের মায়েদের নামে খোলা হিসাবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা পাঠানো হয়। তিন মাস করে বছরে চার কিস্তিতে সরকার এ টাকা দিয়ে থাকে।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666