ঢাকা শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০৮:৪৬ অপরাহ্ন

হার্ডিঞ্জ থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বদলে যাচ্ছে রূপপুর

জাহীদ রেজা নূর
  • প্রকাশিত: বুধবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২১
রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজে ঢোকার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন শ্রমিকেরা। ছবি: ঈশ্বরদী নিউজ টুয়েন্টিফোর

ওই যে, আস্তে আস্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি, তার একটা ইতিহাস আছে। সেই আইয়ুব খানের আমলে, ১৯৬১ সালে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। কোথায় হবে সে বিদ্যুৎকেন্দ্র? ঠিক হয় পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানার পদ্মা নদীর তীরে রূপপুরে হতে পারে এটি। কিছু কিছু কাজ চলে, জমি অধিগ্রহণ করা হয়, কিন্তু ১৯৬৯-৭০ সালে পাকিস্তান সরকার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সে প্রকল্প বাতিল করে দেয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এরপর নানাভাবে নানা গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা বলেন, হ্যাঁ এখানে, পাকশীর রূপপুরেই গড়ে উঠুক বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

২০১১ সালের ২ নভেম্বর বাংলাদেশ ও রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রাশিয়া সফরকালে রাশিয়ার সঙ্গে নির্মাণকাজের প্রস্তুতিপর্বের কাজ সম্পাদনসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর পরের বছরগুলোতে প্রয়োজনীয় সব কাজ সম্পন্ন হয়।

বিদ্যুৎকেন্দ্র ছেড়ে দৃষ্টিনন্দন কয়েকটি বাস চলে গেল গ্রিন সিটির দিকে, তাতে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁরা রুশ দেশের নাগরিক। এসেছেন বাংলাদেশের এই পারমাণবিক কেন্দ্রে কাজ করতে। আমরা যাঁরা আদার ব্যাপারী, তাঁরা এই জাহাজের খবর না নিয়ে বরং সেই তারিখটাকে মনে রাখি, যেদিন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিটের প্রথম কংক্রিট ঢালাই উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারিখটি ছিল ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর। সেদিন থেকেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পথে পা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ।

পাকশীর রূপপুর পাকার মোড়ে গড়ে উঠছে যে বিশাল স্থাপনা, তার গভীরে যেতে হলে পাকশীর জনজীবন নিয়েও জানা থাকা দরকার। বহু আগে যখন এই এলাকা অধিগ্রহণ করা হয়, তখন উচ্ছেদ হওয়া মানুষের ঠাঁই হয়েছিল যেখানে, তারই নাম নতুন রূপপুর। ষাটের দশকের মাঝামাঝি গড়ে ওঠে নতুন রূপপুর। আর এই রূপপুর তখন থেকেই প্রস্তুত হয় একটি

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য।

তারও অনেক আগে কলকাতার সঙ্গে আসাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড আর উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ সহজ করার

জন্য পদ্মা নদীর ওপর একটি ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ব্রিজটি ১৯১০ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ অবিভক্ত ভারতবর্ষের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ব্রিজটির উদ্বোধন করেছিলেন। ব্রিজের নামও দেওয়া হয়েছিল তাঁর নামেই, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ।

এর পর থেকেই ভারতবর্ষের নানা জায়গার মানুষ এসে পাকশীতে বসবাস করতে থাকেন। তা থেকে ঋদ্ধ সংস্কৃতির জন্ম হয় এখানে। ১৯০৪ সালে গড়ে ওঠে পাকুরিয়া স্কুল। ১৯১৮ সালেই দুটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকশীর মানুষ তাদের সাংস্কৃতিক চেতনার প্রকাশ ঘটাতে থাকে। স্কুল, কলেজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, অফিসপাড়ায় মিশ্র সংস্কৃতি—সবকিছু মিলিয়ে এখানে যে জনবসতি গড়ে ওঠে, তা এলাকাটিকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। তবে, দেশের অন্যান্য জায়গার মতো এই এলাকাও ছিল কৃষিপ্রধান। বেশির ভাগ মানুষ কৃষিকাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। চর এলাকায় যে ফসল হতো, তার একটা ছিল আখ। সুগার মিলে আখের চাহিদা পূরণের পথে অনেকটা অবদানই ছিল পাকশীর। এখন অবশ্য আখে ভাটার টান।

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে পাকশীর পরিবেশে লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও সংস্কৃতি সংগঠক আবুল কালাম আজাদ পাকশী বাজারের রেইনট্রির নিচে একটি লোহার টেবিল ঘিরে থাকা চেয়ারে বসে বলতে থাকেন সেই রূপকথার গল্প। বিশদে সে বর্ণনা থাকবে। এখানে শুধু কয়েকটা তথ্য বলে রাখা যাক। আমরা অনেকেই দর্শনির বিনিময়ে নাটকের কথা বলতে গিয়ে রাজধানী ঢাকার কথা বলি। কিন্তু পাকশীতেই হাফিজউদ্দিন মুনশি ১৯৪৬ সাল থেকেই দর্শনির বিনিময়ে নাটক করে এসেছেন। পাকশী বাজারের কাছে অফিসপাড়ায় সবুজে ছাওয়া উদ্যানের পাশে যে হাশেম আলী মিলনায়তন আছে, সেটি স্থাপিত হয়েছিল ১৯১৬ সালে।

কৃষিপ্রধান এই এলাকাটির প্রথমে যদি চেহারা বদলে দিয়ে থাকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, তাহলে এবার আমূল বদলে দিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। তবে এখনই পুরো পাকশীতেই সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে, এটা বললে ভুল হবে। যেসব জায়গায় বিদেশিদের বসবাস, তার আশপাশে সূচনা হয়েছে নতুন দিনের। বেকার যুবক পেয়েছেন চাকরি কিংবা ব্যবসার সন্ধান, কেন্দ্রে মালামাল জোগানের জন্য তৈরি হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেকেই এখানে এসেছেন ব্যবসার স্বার্থে। রুশদের সঙ্গে আলাপ-সালাপ করে তাঁরা দিব্বি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

ভাষাতত্ত্বে বলা হয়, যেখানে একসঙ্গে এক ভাষাভাষী বহু মানুষের বসবাস, সেখানে অন্য ভাষাভাষীরাও সে ভাষা শিখে ফেলে দ্রুত। রূপপুরের গ্রিন সিটি সেই তত্ত্বের সফল পরীক্ষাগার। বাঙালিদের কেউ রুশ ভাষা শিখছে পেটের দায়ে, কেউ শিখেছে রুশদের মন জয় করবে বলে, কেউ বন্ধুত্বের খাতিরে। এখানে এমন অনেক বাঙালি বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন, যাঁরা পড়াশোনা করেছেন সোভিয়েত ইউনিয়নে, যার প্রতিনিধি আজকের রাশিয়ান ফেডারেশন। প্রকল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁরা কাজ করে থাকেন। শ্রমিকদের রুশ ভাষা না জানলেও চলে। তাঁরা শুধু ওপরের নির্দেশ মেনে কাজ করেন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করে নিম্নবিত্ত অনেক মানুষেরই ভাগ্য খুলে গেছে। তাঁদের চেহারায় সমৃদ্ধির ছোঁয়া। সাইকেল থেকে মোটরসাইকেলে উত্তরণকে তারই একটি সূচক হিসেবে ধরা হলে বোধ করি ভুল বলা হবে না।

গ্রিন সিটির রেস্তোরাঁগুলো নিয়ে আলাদাভাবে বলতে হবে। এখানে কেউ কেউ রুশ খাবার পিলমিনি (অনেকটা নেপালি খাবার মোমোর মতো) তৈরির কারখানাও বানিয়েছেন। সুদৃশ্য প্যাকেটে সেই খাদ্য বিক্রিও হচ্ছে গ্রিন সিটির মধ্যে থাকা দোকানগুলোয়।

বেশ কয়েকটি পর্বে আমরা এখানকার বদলে যাওয়া জনজীবনের গল্পই বলব। যা শুনতে শুনতে মনে হতে পারে, এ এক নতুন রুশ দেশের উপকথা পড়ছি। (চলবে)

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666