ঢাকা শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:৫৪ পূর্বাহ্ন

পর্যটন কর্মসংস্থানে পিছিয়ে দেশ

সজীব মিয়া, ঢাকা
  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
পাহাড়ের কোলে রাশি রাশি সাদা পাথরের সৌন্দর্য ইতিমধ্যে মন কেড়েছে পর্যটকদের। গতকাল দুপুরে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জে। ছবি: আনিস মাহমুদ

২০১৯ সালের জন্য ঢাকাকে ‘ওআইসি সিটি অব ট্যুরিজম’ ঘোষণা করেছিল ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি)। কিন্তু বছরের নয় মাস পার হলেও এ নিয়ে কার্যকর কোনো প্রচারণা ও উদ্যোগ নেই সরকারের পক্ষ থেকে। পর্যটন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এতে পর্যটনশিল্প বিকাশের মাধ্যমে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ হারাচ্ছে দেশ।

দেশের পর্যটনশিল্পের এই বাস্তবতা নিয়েই আজ ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। পর্যটন দিবসে ইউনাইটেড ন্যাশনস ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশনের (ইউএনডব্লিউটিও) এবারের প্রতিপাদ্য ‘পর্যটন ও চাকরি: সবার জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ’।

ইউএনডব্লিউটিও বলছে, ২০১৮ সালে বিশ্বের মোট কর্মসংস্থানের ১০ শতাংশ তৈরি হয়েছে পর্যটন খাতে। আগামী বছরগুলোয় সেই হার আরও কয়েক শতাংশ বাড়বে। তবে এই সেপ্টেম্বরেই প্রকাশিত বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিষদের (ডব্লিউইএফ) ভ্রমণ ও পর্যটনবিষয়ক সূচকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এ হার ১ দশমিক ৯ শতাংশ। সংস্থাটির হিসাবে, বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৯ শতাংশ বা ১১ লাখ ৮০ হাজার ৫০০ জন পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত, ২০১৭ সালে যা ছিল ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯০ জন।

পর্যটন কর্মসংস্থানে পিছিয়ে থাকার নানা কারণের মধ্যে দক্ষ জনবলের অভাব, পর্যটনকে শিল্প হিসেবে ঘোষণার পরও যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া, পর্যটননীতিকে আইনে পরিণত না করা, পর্যটন পেশায় আগ্রহী ব্যক্তিদের সামাজিক প্রতিবন্ধকতাসহ নানাবিধ বিষয়কে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ট্যুরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ হোসেন বলেন, ‘৩০ বছর আগে যখন পর্যটন পেশায় আসি, তখন আমার পরিবার এটাকে অনিশ্চিত পেশা হিসেবে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বলেছিল। এত দিন পর পরিস্থিতিটা এখনো সে রকমই রয়ে গেছে। তরুণদের প্রলুব্ধ হওয়ার মতো পেশার মর্যাদা পায়নি পর্যটন।’ এ জন্য তিনি পর্যটনশিল্প নিয়ে সরকারের উদাসীনতাকে দায়ী করেন।

হবিগঞ্জের দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, দেশের পর্যটন খাতে কাজের ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা একটি বড় ব্যাপার। একে তো দক্ষ লোকবলের সংকট, তার ওপর অনেকে প্রশিক্ষিত হয়েও একসময় এ পেশায় যুক্ত হন না। পরিবারের একজন ছেলে বা মেয়ে হোটেল-রিসোর্টে কাজ করছেন—সামাজিকভাবে ব্যাপারটা নিতে পারেন না অনেকেই। সম্মানজনক স্বীকৃতি না পেলে এ পেশায় নতুনেরা আসবেন না।

২০০৭ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হয়েছে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়। এ ছাড়া বেশ কিছু পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কলেজেও পর্যটন বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে যাঁরা ডিগ্রি নিচ্ছেন, তাঁদের বেশির ভাগই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের আওতাভুক্ত ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়টিতে যাঁরা ভর্তি হচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে পাস করে বেরিয়ে মাত্র ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পর্যটনকে পেশা হিসেবে নেন বলে জানালেন বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভুঁইয়া।

বদরুজ্জামান ভুঁইয়া বলছিলেন, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে পর্যটন পেশা হিসেবে আকর্ষণীয় নয়। এ খাতে নিজেদের লক্ষ্য নিয়ে সংশয়ে থাকেন তাঁরা। পর্যটন নিয়ে সরকারি ভূমিকা জোরালো নয় বলে মনে করেন তিনি। দেশের পর্যটন নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি আছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে না রেখে পর্যটনকে স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া পর্যটনের নীতিনির্ধারণী কাজগুলো যাঁরা করবেন, তাঁদের পর্যটন বিষয়ে পেশাগত দক্ষতা থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এনএইচটিটিআই) দুই বছরের ডিপ্লোমাসহ পর্যটনের বিভিন্ন বিষয়ে স্বল্পমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে এ খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কাজ করছে। ১৯৭৪ সালে চালু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ৫০ হাজার প্রশিক্ষণার্থী বেরিয়েছেন বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ পারভেজ আহমেদ চৌধুরী। তিনি জানান, এখান থেকে কোর্স শেষ করা প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুযোগ পেয়েছেন।

পারভেজ আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, দেশের কলেজ ও বিভিন্ন ইনস্টিটিউটে যে পর্যটন ও হোটেল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ডিগ্রি দেওয়া হয়, তা আরও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে না হয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আওতায় এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
%d bloggers like this: