ঢাকা শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০১:০৭ পূর্বাহ্ন

হাসপাতালে এডিসের পছন্দের পরিবেশ

সৈয়দ ঋয়াদ
  • প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ আগস্ট, ২০১৯
হাসপাতালে এডিসের পছন্দের পরিবেশ।

দেড় দুই হাজারেরও বেশি ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা হয়েছে, এখনো ভর্তি সাত শতাধিক। কিন্তু সেই হাসপাতালেই মশার ছড়াছড়ি। আর চারপাশে যে পরিবেশ, তাতে সেখানেও থাকতে পারে মশার প্রজননক্ষেত্রে-এটা খালি চোখেই দেখা যায়। কিন্তু ডেঙ্গু দুর্যোগের মধ্যেও হাসপাতালটিতে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সচেতনতা দেখা যায়নি।

হাসপাতালে পঞ্চম তলার তিনটি এক্সটেনশন বিল্ডিংয়ের ছাদে জমে আছে পানি। আর এই রকম পরিবেশে ডেঙ্গুর বাহক এডিস ইজিপ্টি মশার বংশবিস্তার হয়-বলেছেন কীটতত্ত্ববিদরা।

গত মঙ্গলবার বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ বি এন নাগপাল ঢাকায় একটি সেমিনারে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি যেসব স্থানে নজর রাখার পরামর্শ দেন তার একটি হলো হাসপাতাল।

এডিস মশা মানুষের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। ড. নাগপাল বলেছেন, স্ত্রী মশাগুলো খুবই বুদ্ধিমতি। তারা এমন জায়গায় ডিম পারে যেখানে পরে পানি জমতে পারে এবং এই পানিতেই ডিম থেকে লার্ভা হয়। আর তিন দিনেই লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ মশার জন্ম হয়।

মুগদা হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান এই মশার জন্মের জন্য খুবই উপযুক্ত হিসেবেই চোখে পড়ে। কিন্তু পানি জমা প্রতিরোধে কোনো উদ্যোগ কখনো ছিল না।

হাসপাতালের পঞ্চম তলার পশ্চিম পাশে ডেলিভারি ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশেই একটি বিল্ডিং। গতকাল বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই সেখানে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।

একই ফ্লোরের উত্তর ও পূর্ব পাশে আরও দুইটি ভবনের ছাদে গিয়েও দেখা গেছে একই চিত্র। প্রতিটি ছাদেই ময়লার স্তুপের সঙ্গে পানি জমে আছে বহুদিন ধরে। ময়লা আর শ্যাওলায় ভর্তি পরিবেশই বলে দেয়, পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ওই পথ মারায় না। একটি ছাদেও নেই পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা।

এই ছাদের নিচের রোগীরা জানাচ্ছেন, মশার উপদ্রবে অস্থির তারা। সন্তান প্রসবের স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে নিয়ে আসা সোহাগ মিয়া বলেন, ‘সারাদিনই কানের কাছে মশা ভন ভন করে।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন কি না- এমন প্রশ্নে সোহাগ বলেন, ‘এখানে যারা কাজ করে সবাই জুলুমবাজ। ওয়ার্ড বয়গুলো পয়সা ছাড়া সিট দেয় না। মশার ওষুধ দেয় না। আর ওষুধ দিয়েই লাভ কী? এখানেইতো মশার কারখানা। কয়টা মারবে।’

তিনটি ছাদে পানি জমে থাকার চিত্র ফোনে ধারণ করে মুগদা হাসপাতালের পরিচালক আমিন আহমেদ খানকে দেখালে প্রথমে অসন্তোষ দেখান তিনি। খানিকটা রাগত স্বরে বলেন, ‘এই এক্সটেনশন বিল্ডিংয়ের কাজ চলছে এখানে বৃষ্টির পানি জমে আছে। পুরোনো কোনো পানি এখানে নেই।’

চ্যালেঞ্জ করলে পরিচালক নিজেই বলেন, ‘চলেন দেখে আসি।’ স্বশরীরে গিয়ে ময়লা আর পানি জমে থাকার দৃশ্য দেখে পিডব্লিউডির রেজা নামের এক কর্মকর্তাকে ফোন করে শাসাতে থাকেন। তবে পিডব্লিউডির ওই কর্মকর্তা কিছুই বলতে পারেননি এসব বিষয়ে।

পানি জমে থাকার বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘আমাকে এখনও এই বিল্ডিং বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। বুঝিয়ে না দিলে কীভাবে পরিষ্কার করব?’

কিন্তু যখন ডেঙ্গুর বিস্তার হচ্ছে, আর এমন পরিবেশ যেখানে এডিসের প্রজনন স্থল হতে পারে, সেখানে ভবন বুঝিয়ে দিল কি না দিল, সেটা ভাবার সুযোগ আছে কি? এমন প্রশ্ন করলে হাসপাতাল পরিচালক জবাব না দিয়ে মেজাজ দেখান।

কথা বলার সময় উপস্থিত হন হাসপাতালের উপ-পরিচালক খাইরুল আলম। পরিচালকের সামনেই কথার প্রসঙ্গে উপপরিচালক বলে উঠেন, ‘ওইদিন টেলিভিশন ও বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিকরা ছাদের উপর উঠতে চেয়েছিল। আপনি তো (পরিচালক) অনুমতি দেননি।’

উপ পরিচালকের এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পরিচালক বলেন, ‘আমি কখন না করলাম?’

ময়লা জমে থাকার বিষয়ে দায় নিতে রাজি না হলেও পরে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে পানি নিষ্কাশন করবেন বলে আশ^স্ত করেন এই পরিচালক।

হাসপাতলের চিকিৎসক-নার্সসহ ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩০

জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের খবর অনুযায়ী রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গত এক মাসে ১০ জন চিকিৎসক ও ২০ জন নার্সসহ মোট ৩০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে দুই চিকিৎসক এবং দুই নার্স দায়িত্ব পালন করতেন আইসিইউতে।

এই তথ্যটি বলে দেয়, এই হাসপাতালেও এডিসের আস্তানা থাকতে পারে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সময় হয়নি তাদের পরিবেশের দিকে নজর দেওয়ার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কিটতত্ত্ববিদ ডা. ভূপেন্দর নাগপাল মঙ্গলবার ঢাকায় একটি সেমিনার করেছেন। তার মতে, মানুষের বাসা বাড়ি ছাড়াও এডিস থাকে হাসপাতালের নিচে খোলা জায়গায়, ছাদে, পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্রে।

স্কুল, হাসপাতাল, শহরের ঘরবাড়ি, নির্মাণ এলাকা ও অফিসের মতো বিভিন্ন স্থাপনা পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা যায় বলেও পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
%d bloggers like this: