ঢাকা শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ০৯:০৬ অপরাহ্ন

রোহিঙ্গা শিবির: সুবিধা পেতে ২০ মাসে লাখো শিশুর জন্ম

উম্মুল ওয়ারা সুইটি
  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০১৯
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির। ছবি: এএফপি

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ভয়ে দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ঘরে প্রতিদিন ৬০-৮০ শিশুর জন্ম হচ্ছে। গত ২০ মাসে নতুন করে আসা রোহিঙ্গা শিশুর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। এছাড়া বর্তমানে ২০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী সন্তানসম্ভবা। ফলে আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুর সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এদিকে কূটনীতিক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা বলেছেন, এর আগে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া নিবন্ধনভুক্ত চার লাখ রোহিঙ্গা পরিবারে আরও এক লাখ শিশু জন্ম নিয়েছে। এছাড়া ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে যে সাত লাখ রোহিঙ্গা এসেছে এদের মধ্যেও ২ লাখ ৪০ হাজার শিশু-কিশোর রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রত্যাবাসনকাল বেশি দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশু ও এখানে বড় হওয়া শিশু-কিশোরদের নাগরিকত্ব নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেও উদ্বিগ্ন। তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দিয়ে রোহিঙ্গা শিশুদের ওপর জরিপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় এনজিওদের কার্যক্রমের ওপরও নজর রাখতে বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রী ব্রুনাই থেকে ফিরে সংবাদ সম্মেলনেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অধিক জন্মহারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই দ্রুত এদের ভাসানচরে প্রত্যাবাসনের সমর্থন আদায় করতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব বলেছেন, কিছু এনজিও রোহিঙ্গা শিশুদের এবং মায়েদের জন্য সামান্য পরিমাণে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে তাদের সন্তান প্রসবে উৎসাহিত করছে। তারা মনে করছে, সন্তান হলেই তার জন্য আলাদা ভরণপোষণ পাওয়া যাবে। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে জন্ম নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও তারা সেটি মানছে না।

আরও একটি বিষয় আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা হলো বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এবং এখানে শিশু-কিশোর বয়স থেকে বেড়ে ওঠা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে কি না? সবকিছু মিলিয়ে অধিক হারে

রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রোহিঙ্গা শিশুদের নাগরিকত্ব বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ দেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের জন্মসূত্রে বাংলাদেশি বলা যাবে না। আর সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। বিষয়টি সরকারের রোহিঙ্গাবিষয়ক নীতির ওপর নির্ভর করছে।

অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দ্রুত দিক-নির্দেশনা দেওয়া উচিত। এখন যেমন প্রাপ্তবয়স্কদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রেশন করা হচ্ছে, সেভাবে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শিশুদেরও নিবন্ধন করা হবে কি না সে বিষয়ে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাবা-মা রোহিঙ্গা হওয়ায় এ দেশে জন্ম নেওয়া তাদের শিশুরাও স্বাভাবিকভাবেই রোহিঙ্গা বা মিয়ানমারের নাগরিক বলে বিবেচিত হবে। তারা এ দেশে জন্ম নেওয়ার সুবাদে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হবে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতি একটু অন্যরকম। তারা এখানে অস্থায়ীভাবে রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে আটকেপড়া বিহারিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার আগপর্যন্ত তাদের বিহারি হিসেবেই আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে সুযোগ নেই, এই শিশুরা রোহিঙ্গা হিসেবেই তালিকাভুক্ত হবে।’

আসিফ মুনীর বলেন, ‘যদি কোনো কারণে তাদের এই দেশে থেকে যেতেই হয়, তাহলে সেটা অনেক পরের বিষয়। এছাড়া মিয়ানমারের সঙ্গে যদি কখনো এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, তাহলে এসব শিশুর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, তা গুরুত্ব দিতে হবে। আবার যেসব শিশু বাবা-মা ছাড়া আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে এসেছে, তাদের কে গ্রহণ করবে, এসব বিষয়ও আলোচনায় থাকতে হবে। এখন পর্যন্ত মনে হয়, এই শিশুদের রোহিঙ্গা বা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবেই দেখা হবে।’ তিনি বলেন, ‘যেসব শিশু বাংলাদেশে জন্ম নিচ্ছে, তাদের তালিকা তৈরি করা উচিত। নাগরিকত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেই তালিকা যেন বাংলাদেশের কাছে থাকে। এসব শিশুর জন্ম তারিখ, ব্লাড গ্রুপ চেক করে রাখাসহ প্রয়োজনে তথ্য থাকা উচিত।’

উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মঈনউদ্দিন বলেন, একটি ক্রাইটেরিয়া ছিল জন্ম নিবন্ধনের সার্টিফিকেটে একটি সিল থাকবে, সেখানে লেখা থাকবে তারা মিয়ানমারের নাগরিক। ওই জন্ম নিবন্ধনের কাজটাও চলছিল শুধু নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের জন্য। কিন্তু এই নিবন্ধিতদের বাইরেও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ছিল, যাদের বিষয়ে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। এবার এই রোহিঙ্গা আসার পর থেকে কক্সবাজারের পুরো জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়াটাই বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করছি আগে। এরপর সরকার যেভাবে নির্দেশনা দেবে, সেভাবেই কাজ হবে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো ইনস্ট্রাকশন নেই।

রোহিঙ্গা শিশুরা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাবে কি না- জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, রোহিঙ্গা শিশুদের নাগরিকত্বের বিষয়ে এ মুহূর্তে কিছু বলা সম্ভব নয়। এটি পুরোপুরি সরকারের পলিসির ওপর নির্ভর করছে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক ওয়ালি উর রহমান বলেন, তাদের এ দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার কোনো সুযোগ এখনো নেই। তবে এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে সরকারের পলিসির ওপর। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা না করলে আমাদের নাগরিক জীবনে ভয়াবহ চাপ পড়বে।

ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের দেওয়া তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ নারী। এদের মধ্যে ১৩ শতাংশ কিশোরী এবং ২১ শতাংশ গর্ভবতী ও প্রসূতি। শিশুদের মধ্যে ৬-১৮ বছর বয়সী শিশুর হার ২৩ শতাংশ, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর হার ২১ শতাংশ এবং ১ বছরের কম বয়সের শিশুর হার ৭ শতাংশ।

কক্সবাজার পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. পিন্টু কান্তি ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে আসে, তখন প্রথম তিন মাসে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৪৮০ জন গর্ভবতী নারীর। তার মধ্যে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব হয় সাড়ে পাঁচ হাজার শিশু আর বাকিগুলো হোম ডেলিভারি হয়। ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে পরবর্তী ২০ মাস রোহিঙ্গা নারীদের গর্ভধারণ হার আগের মতোই ছিল। সে হিসেবে রোহিঙ্গা নবজাতকের সংখ্যা এক লাখের কম নয়। গত কয়েক মাস আমরা জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করার পর অনেক সচেতন হয়েছে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। আমরা এ পর্যন্ত ৬৮ হাজার নারীকে ইনজেকশন দিয়েছি, ৬৫ হাজার নারীকে জন্মনিয়ন্ত্রন ওষুধ দিয়েছি। এছাড়া তিন বছর মেয়াদি ও ১০ বছর মেয়াদি ইনজেকশন দিয়েছি আরও প্রায় ছয় হাজার জনকে।

ক্যাম্পের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সদ্য সন্তান প্রসব করবে এমন নারীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। রোহিঙ্গাদের জন্ম নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা না গেলে তা বাংলাদেশের জন্য নতুন ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে।

টেকনাফ ক্যাম্পের ডা. আয়েশা কবির বলেন, রোহিঙ্গা নারীদের মধ্যে গর্ভধারণের প্রবণতা অনেক বেশি। ২০ বছরের একজন রোহিঙ্গা নারীর অন্তত তিনটি করে সন্তান আছে। পরিবার-পরিকল্পনার কথা বললেও তারা রাজি হয় না। বরং ডাক্তার, নার্সদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। একেকটি রোহিঙ্গা পরিবারে পাঁচ-ছয়জন শিশু আছে। কারণ প্রত্যেক শিশুর জন্যই কার্ড পাওয়া যায়। যে কার্ড দেখিয়ে খাবার, ওষুধ ও কাপড়সহ নানারকম সুবিধা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন অন্তত ৬০ শিশু জন্ম নিচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেইগবেডার এই তথ্য জানান।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী তিন মাসে মিয়ানমারে সেনা নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে আশ্রয় নেয় ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নারী গর্ভবতী অবস্থায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে ১৯৬৮ সাল থেকে বাংলাদেশে আশ্রিত রয়েছে আরও অন্তত চার লাখ রোহিঙ্গা। নতুন করে অনুপ্রবেশের পর গত ২০ মাসে এখানে জন্ম নিয়েছে আরও প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শিশু। জানা গেছে, ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন গড়ে জন্ম নিচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ শিশু।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
%d bloggers like this: