ঢাকা মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১১:১২ অপরাহ্ন

পুরান ঢাকার নড়বড়ে ভবনগুলোর বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ কী?

ঈশ্বরদীনিউজ২৪.নেট, প্রতিবেদন
  • প্রকাশিত: শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৯
এভাবেই ঝড়ে পড়ছে পুরান ঢাকার ভবনগুলোর পলেস্তারা

 

ভয়াবহ মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে প্রতিটি রাত কাটছে পুরান ঢাকার শাঁখারিবাজার, ফরাশগঞ্জসহ আরও বেশকিছু এলাকার অতিপুরানা ভবনগুলোর বসবাসকারীদের। সরকারি বিধি-নিষেধের কারণে বসবাসকারীরা ভবন সংস্কারও করতে পারছেন না। কেউ সামর্থের অভাবে পারছেন না সংস্কার করতে। কিন্তু মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বাস করে যাচ্ছেন ঠিকই।

ফরাশগঞ্জ ও শাঁখারিবাজারের প্রতিটি ভবন দেড় থেকে ২০০ বছরের পুরনো। এ সব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের দেয়ালের আস্তর অনেক আগেই খসে পড়েছে। অনেক বাড়ির ইটের গাঁথুনি নড়বড়ে হয়ে গেছে। দেয়ালে বড় বড় ফাটলের চিহ্ন স্পষ্ট। বৃষ্টি নামলেই দেয়াল বেয়ে পানি প্রবেশ করে বাসগৃহে।

২০০৪ সালে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে ভবন ধসে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর রাজউক, বুয়েট ও ঢাকা সিটি করপোরেশন কারিগরি জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও ঐতিহ্যবাহী ভবন শনাক্ত ও তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। ১৫৭৩টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে ঢাকায় শতাধিক হেরিটেজ ভবন শনাক্ত করা হয়। যার মধ্যে ৯৩টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে শনাক্ত করা হয়।

অন্যদিকে, ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) জিওডেসেক কনসালট্যান্টস অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তালিকা করে পুরান ঢাকার ৫৭৩টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে পাঁচ বছর আগে। এর মধ্যে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৪৫টিকে এখনই ভেঙে ফেলা উচিৎ বলে মন্তব্য করেছিল তালিকা প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানটি। যার মধ্যে রয়েছে ২১টি হাজারীবাগে, ৭৩টি লালবাগে ও ৯১টি শাঁখারিবাজারে।

রাজউক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তথ্য অনুযায়ী রাজধানীতে ৫৭৩টি ভবন হেরিটেজ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে ৩২১টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ২৫২টি হেরিটেজ ভবন তালিকাভুক্ত রয়েছে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান বলেন, এসব এলাকার কিছু ভবন মালিকরা সংস্কার করেছেন। কিছু মালিককে বলা হয়েছে ভবন ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে বা সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। আসলে এভাবে পুরান ঢাকাকে সুরক্ষিত করা অনেক কঠিন। আমরা পুরান ঢাকাকে নিয়ে নতুন করে ভাবছি। নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

২০১১ সাল থেকে জাইকার সহযোগিতায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদফতর পরিচালিত চার বছর মেয়াদি আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে নির্মিত ঢাকার ২ হাজার ১৯৩টি সরকারি ভবনের ৫৯ শতাংশই ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে।

পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রূপলাল হাউসটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দেখা গেছে। দোতলা ভবনের নিচের অংশ দখল করেছে ফরাশগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। তারা আদা-রসুন, পেঁয়াজ, হলুদ ও মরিচের আড়ত গড়েছেন। ব্যবসায়ী আরাফাত হোসেন জানান, প্রতিদিনই ভবনের গা থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা।

শাঁখারী বাজার ১০ নম্বর লেনের বাসিন্দা গোবিন্দ চন্দ্র দে জানান, প্রায় দেড়শ বছর আগে তার দাদা পুরাতন এ বাড়ি কিনেছিলেন। বংশপরম্পরায় বর্তমানে ৫ ভাইয়ের সঙ্গে এ বাড়িতেই বসবাস করছেন তিনি। তবে প্রাচীন স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এ বাড়ির ভেতরের দেয়াল থেকে খসে পড়েছে পলেস্তারা।

দেখা গেছে, কোর্ট কাচারি পার হয়ে শাঁখারিবাজারে ঢুকতেই দুই পাশে শত শত বছর আগের বাড়ি-ঘর। প্রতিটি বাড়ির নিচে দোকান, আর উপরে রয়েছে পরিবারের বসবাস।

হেরিটেজ সংরক্ষণের অভাব এবং পুনঃসংস্কারের যথাযথ নীতিমালা না থাকায় ঝুঁকির মধ্যেই বাস করছেন তারা।

সূত্রাপুরের ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো ভবনের মধ্যে রয়েছে-  ২৬ নম্বর বি কে দাস রোডের বাড়ি। ৭, ৪০, ২২, ৪৪, ৪৫, ৪৬, ১২/১, ৫৯ ও ৬২ নম্বর বাড়িগুলো। এসব বাড়ির নিচের তলায় চলে ছাপাখানার কাজ, আর উপরে বসবাস। বি কে দাস রোডের ৬৫ নম্বর দৃষ্টিনন্দন বাড়িটিতে অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যেও চলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। কিছু অংশে পরিবার আছে।

কালীচরণ সাহা রোডের তিনশ বছরের পুরনো মিল ব্যারাকটিও রয়েছে ঝুঁকিতে। ১৭ নম্বর সূত্রাপুর কাঁচাবাজার রোডের বাড়িটিও দীর্ঘদিন ধরে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে।

শাঁখারিবাজার ১০ নম্বর লেনের বাসিন্দা বিমল বিশ্বাস জানান, প্রায় দেড়শ বছর আগে তার দাদা পুরাতন এ বাড়ি কিনেছিলেন। তাদের সামর্থ নেই বাড়ি সংস্কারের। আবার আইনি জটিলতায় তারা ডেভেলপারকেও দিতে পারছেন না।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান বলেন, পুরান ঢাকাকে ৬টি অঞ্চলে ভাগ করে একটি বৃহৎ জরিপ পরিচালনা করা হবে। যার মাধ্যমে আমরা বের করব, সুন্দর-প্রশস্ত রাস্তা কীভাবে বের করা যায়, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ-মেরামত কীভাবে করা যেতে পারে, দুর্যোগ হলে কীভাবে তা সহজে মোকাবিলা করা যেতে পারে ইত্যাদি। এই জরিপ অনুযায়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে পুরান ঢাকা সুরক্ষিত ও নিরাপদে বাসযোগ্য হিসেবে রূপ পাবে।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
%d bloggers like this: