ঢাকা রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০৪:৩৬ অপরাহ্ন

হুড়োহুড়ি-ভোগান্তি এড়াতে বিকল্প কী করতে যাচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত: রবিবার, ১৬ মে, ২০২১
ঈদের আগে গাদাগাদি করে ফেরিতে উঠছেন মানুষ। ফাইল ছবি

ঝিনাইদহের রাকিবুল ইসলাম ঢাকার একটি বেসরকারি কোম্পানিতে নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি করেন। ঈদের পাঁচ দিন আগে ঢাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় প্রথমে মাওয়া ঘাটে যান। পরে ফেরিতে করে মাদারীপুরে যান। সেখান থেকে আবার মাইক্রোবাসে করে গ্রামের বাড়ি যান। ঈদের ছুটি শেষে ১৭ মে তাঁর ঢাকায় কাজে যোগ দেওয়ার কথা।

রাকিবুল ইসলাম মুঠোফোনে  বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামে এসেছি। ঈদও শেষ। এখন ঢাকায় যাব, কাজে যোগ দেব। কিন্তু ঢাকায় যাওয়ার তো কোনো গাড়ি নেই। তবে চাকরি বাঁচানোর জন্য যেভাবেই হোক ঢাকায় ফিরতে হবে।’

মোবাইল ফোন অপারেটরদের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের আগে রাকিবুল ইসলামের মতো ৬৫ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়ে গ্রামে গেছেন। ঈদের ছুটি শেষ হচ্ছে শনিবার। কাল রোববার থেকে আবার কাজে যোগ দেবেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাই আজ শনিবার সকাল থেকে অনেকে আবার ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। মাদারীপুর, মাওয়া, পাটুরিয়া ফেরিঘাটগুলোয় আবার ঢাকামুখী যাত্রীদের ভিড় শুরু হয়েছে।

করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় সরকারি বিধিনিষেধে গত ৫ এপ্রিল থেকে দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ। মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বেশি ভাড়া দিয়ে গাদাগাদি করেই যেতে হয়েছে তাঁদের। এতে স্বাস্থ্যবিধি যেমন মানা হয়নি, তেমনি ভোগান্তিও হয়েছে।

সাধারণ মানুষ আবারও কি হুড়োহুড়ি করে, স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই কাজের জন্য ঢাকায় ফিরবেন। নাকি বিকল্প কোনো ব্যবস্থা বা নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। এমন প্রশ্ন অনেকের মধ্যেই।

যদিও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ঈদযাত্রা নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, ফেরার সময় সেই পরিস্থিতি এড়ানোর পক্ষে। তারা বিকল্প কোনো পন্থা চায়। এ জন্য কিছু সুপারিশও দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি এখন সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বলেছে তারা।
করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি বিশেষজ্ঞ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ মুঠোফোনে বলেন, ‘ঈদের আগে যেভাবে মানুষ ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি না মেনে গ্রামে ফিরে গেছেন, তাতে গ্রামেও করোনা পরিস্থিতি বাড়বে। ঈদের পরও যদি মানুষ একইভাবে একসঙ্গে সবাই ঢাকায় ফিরে আসেন, তাহলে শহরেও করোনা পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। ঈদের ছুটি শেষে মানুষ ফিরতে শুরু করেছেন। তাই এখনই একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঢাকায় ফিরতে পারেন। সে জন্য অল্প সময়ের জন্য দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তবে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে যেন এসব পরিবহন চলাচল করে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঈদ উপলক্ষে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে মানুষ যেভাবে ভিড় জমিয়ে বাড়ি গেছেন, তাঁদের ফিরতি যাত্রা বিলম্বিত করতে সুপারিশ করা হয়েছে। পরে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে যেন তাঁদের ফেরানো হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনায় সরকারি বিধিনিষেধের মধ্যেও ঈদের আগে মানুষ ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি না মেনে যেভাবে বাড়ি ফিরে গেলেন, তাতে করোনার সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকিটা থেকেই যাচ্ছে। আবার যদি একই ভাবে গ্রামে ফিরে যাওয়া লাখো মানুষ গাদাগাদি করে ঢাকায় ফিরে আসেন, তাতে করোনার সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজীর আহমেদ শনিবার  বলেন, ‘মানুষ ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। অথচ দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ। ঈদের আগের যে চিত্র ছিল, সেই একই চিত্র আবার আমরা দেখতে পাব কাল থেকে। কিন্তু এটার ফল যে কত খারাপ হতে পারে, সে বিষয়টি আমরা নজর দিচ্ছি না। গ্রামে ফিরে যাওয়া ৬০ লাখ মানুষ কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঢাকায় ফিরতে পারেন, সেই ব্যবস্থাপনা থাকাটা জরুরি। যাঁরা গার্মেন্টসের কর্মী, তাঁদের আনার জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’

ব্যবস্থাপনা থাকা জরুরি

গত ৫ এপ্রিল থেকে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। তখনো সরকারি কঠোর বিধিনিষেধে ঘোষণার পর অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ ঢাকা ছেড়ে চলে যান। এরপর ঈদের কয়েক দিন আগে মানুষ ঢাকা ছাড়তে শুরু করেন। দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ বন্ধ থাকায় মানুষ মাইক্রোবাস, ট্রাক, পিকআপে করে গ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। ফেরিঘাটে শত শত মানুষ ন্যূনতম শারীরিক দূরত্ব বজায় না রেখে পারাপার হন।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ঈদের আগে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি না মেনে লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। ফেরিতে শত শত মানুষ যেভাবে গাদাগাদি করে গেছেন, সেটা অকল্পনীয়। করোনা নিয়ন্ত্রণে যেখানে সরকারি বিধিনিষেধ চলছে, সেখানে এমন দৃশ্য কল্পনা করা যায় না। ঈদের ছুটি শেষে আবারও মানুষ ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। কিন্তু মানুষ যদি স্বাস্থ্যবিধি না মেনে আবারও গাদাগাদি করে ঢাকায় ফেরেন, তাহলে তো বিপদ। এসব মানুষকে ঢাকায় ফেরানোর জন্য একটা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা দরকার।’

অবশ্য দূরপাল্লার বাসের শ্রমিক ও পরিবহনমালিকেরা দাবি করেছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে তাঁরা বাস চালাতে চান। ৩৮ দিন দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ থাকায় লাখো শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। এ জন্য তাঁরা খাদ্যসহায়তাও চেয়েছেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি সাংসদ মসিউর রহমান রাঙ্গা  বলেন, ‘করোনায় গেল বছর ৬৮ দিন দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ ছিল। আবারও ৩৮ দিন দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ। বাস বন্ধ থাকায় অন্য সময়ের তুলনায় মানুষ দ্বিগুণ/তিন গুণ টাকা খরচ করে গ্রামে ফিরে গেছেন। ফেরিতে একজন মানুষের পক্ষেও কি স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হয়েছে। ফেরিতে মানুষও মারা গেলেন। অথচ বাস চালু থাকলে তো এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। আবারও মানুষ গ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। বাস চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রীরা নিরাপদে ঢাকায় ফিরতে পারবেন।’

অবশ্য ফেরিতে যাতে আর কোনো মানুষ হুড়োহুড়ি করে না উঠতে পারে কিংবা নামতে পারে, সে জন্য ফেরি ঘাটগুলোয় সার্বক্ষণিক ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন। তিনি শনিবার মুঠোফোনে  বলেন, ‘ঈদের আগে শত শত মানুষ ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি না মেনে যেভাবে ফেরিতে করে পারাপার হয়েছেন, সেটি যাতে আর না হয়, সে জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যে ফেরিতে মানুষ যাতায়াত করবেন, সেই ফেরিতে কোনো যানবাহন থাকবে না। যানবাহন পারাপারের ফেরিতে কোনো মানুষ উঠতে পারবেন না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাতে মানুষ পারাপার হন, সেটি নজরদারি করা হবে।’

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন জানান, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে যেভাবে মানুষ ফেরিতে যাতায়াত করেছেন, সে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় লঞ্চ ও ট্রেন
করোনায় সরকারি বিধিনিষেধে গত ৫ এপ্রিল থেকে লঞ্চ ও ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। লঞ্চ ও ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় সড়কপথে মানুষ গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছেন।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিধিনিষেধ চলবে ২৩ মে পর্যন্ত।
ঢাকা মহানগরসহ অন্যান্য জেলার মধ্যে বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহন চলাচল করছে।
লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে রয়েছেন লঞ্চশ্রমিকেরা।

লঞ্চ চলাচল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক  বলেন, ‘করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারি সিদ্ধান্তে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এখন পর্যন্ত লঞ্চ চলাচলের কোনো অনুমতি দেয়নি সরকার। সরকারি নির্দেশনা পেলেই কেবল লঞ্চ চলাচল শুরু হবে।’

করোনার আগে ঈদের সময় কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘরমুখী মানুষদের ভিড় লক্ষ করা যেত। তবে করোনায় টানা ৩৮ দিন ধরে ট্রেন বন্ধ।

ট্রেন চলাচলের অনুমতি প্রসঙ্গে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘সরকারি সিদ্ধান্তে করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে ট্রেন চলাচল বন্ধ। ঈদের আগে মানুষ যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বাড়ি ফিরে গেছেন, সেটা ঠিক হয়নি। ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। সেখানে করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু অনেক। নেপালেও অবস্থাও খারাপ হয়েছে। বিষয়টি আমাদের সবার মাথায় রাখতে হবে। সরকার যখন রেল চলাচলের অনুমতি দেবে, তখন রেল চলাচল শুরু হবে।’

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666