ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন

রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করতে মিয়ানমারকে বোঝাবে চীন

মহিউদ্দিন মাহমুদ, বেইজিং, চীন থেকে
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৪ জুলাই, ২০১৯
‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’ এ দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক।

রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই সংকটের সমাধান রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একমত হয়েছে চীন। একই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এ সংকট সমাধান করতে মিয়ানমারকে বোঝানোর আশ্বাস দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং।

বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় ভবন ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’ এ দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে চীনের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন চেষ্টা করবে বলে জানান।

পরে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের ব্রিফিং একথা জানান। এসময় প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার নজরুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।

পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের জানান, দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দু’দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি রোহিঙ্গা, অর্থনীতি ও বাণিজ্য, প্রকল্প বাস্তবায়ন, কানেক্টিভিটি ও ভিসা সংক্রান্ত পাঁচটি ইস্যু বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

শহীদুল হক বলেন, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যেতে একটা সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য চীনকে ভূমিকা পালনের অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা, সম্মান ও নাগরিকত্ব পেয়ে রাখাইন রাজ্যে ফিরে যেতে পারে এবং তারা নিজের ভূমি ও সম্পত্তির ওপর অধিকার ফিরে পায়।

পররাষ্ট্র সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের জবাবে চীনা প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বুঝতে পারি এটা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

শহীদুল হক বলেন, মানবিক কারণে রোহিঙ্গারে আশ্রয় দেওয়ায় তারা (চীন) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন এটি (রোহিঙ্গা সংকট) অনেক বড় সমস্যা তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, তারা (চীন) মনে করে, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে মিলে এর সমাধান করতে হবে। এ ব্যাপারে চীন আগেও সহযোগিতা করেছে, কেননা ওনারা বলেছেন বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়েই চীনের বন্ধু।

শহীদুল হক বলেন, দু’দেশ মিলে যাতে এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দু’বার পাঠিয়েছেন প্রয়োজন হলে আবারও পাঠাবো।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, তারা (চীন) চেষ্টা করবেন যে দু’দেশের আলোচনার মধ্যই যেন এ সমস্যার সমাধান খুঁজে পায় এবং চায়না মিয়ানমারকে এ ব্যাপারে বোঝাবে, বলছে এবং বলবে।

রোহিঙ্গা সংকটের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শান্তি ও স্থিতিশীল, উন্নয়নের জন্য এটা খুব দরকার। জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কারণে ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যত দিন যাবে এই চ্যালেঞ্জটা বড় হবে। সুতরাং, দ্রুত এর সমাধান করা দরকার। সমাধান হলো এরা যেন তাদের নিজস্ব মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারে।

পররাষ্ট্র সচিব জানান, রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে চীনা প্রধানমন্ত্রী একমত। যে মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এর আগে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করেছি। সব ধরনের চেষ্টা করেছি। রোহিঙ্গা মিয়ানমারে যেতে চায় না। কারণ তারা মনে করে ওখানে তাদের ভয় আছে। তারা ফিরে যেতে ভয় পায়।

জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়ে মাতৃভূমি মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমার বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তারা এ জন্য কিছুই করছে না।

পররাষ্ট্র সচিব জানান, বৈঠকের শুরুতে চীনের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় অভিনন্দন জানান।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সুসম্পর্কের কথা তুলে ধরে চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশ চীনের অংশীদার।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও উচ্চপর্যায়ে নিতে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন চীনের প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের এখন কৌশলগত অংশীদারিত্ব আছে। এটা আরও গভীর হবে, শক্তিশালী হবে বলে তারা আশা করে। এবং তারা মনে বাংলাদেশের যে উন্নয়ন হয়েছে তা অব্যাহত থাকবে। তারা বাংলাদেশকে সহায়তা করবে।

এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দেই। মানুষের কল্যাণে যেন শান্তিপূর্ণ উন্নয়ন বিঘ্নিত না হয় তার জন্য আমরা একসঙ্গে কাজ করে যাবো। আমাদের অনেক যৌথ স্বার্থ রয়েছে।

ইকোনোমি অ্যান্ড ট্রেড ইস্যুতে চায়নিজ প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত বছর বাংলাদেশ ও চায়নার বাণিজ্য বেড়েছে ১৬ শতাংশ।

বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

চায়নিজ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা ভারসাম্যহীন বাণিজ্য চাই না। আমরা ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য চাই।

এটা বাস্তবায়ন করতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

চীনা প্রধানমন্ত্রী জানান, এফটিএ ফিজিবিলিটি স্ট্যাডিতে কি ফলাফল আসছে সেটা তারা ক্লোজলি মনিটর করছেন।

প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রকল্পের বাস্তবায়নটা একটু ত্বরান্বিত করা দরকার।

অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার বিষয়ে চীনের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ একটা ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন সেন্টারের ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আগামী সপ্তাহে অ্যাডাপটেশন কমিশনের প্রধান জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশ আসছেন। একটা ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন সেন্টার করার চিন্তা-ভাবনা করছি। এ বিষয়ে চীন সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তিস্তা রিভার কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিস্টোরেশন প্রজেক্টের ব্যাপারে সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী।

ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পর্যন্ত হাই স্পিড ট্রেন প্রজেক্টের দ্রুত বাস্তবায়ন চেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পররাষ্ট্র সচিব জানান, ভিসা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চায়নিজরা বাংলাদেশে অন অ্যারাইভাল ভিসা পায়। সেই একই ধরনের ট্রিটমেন্ট বাংলাদেশ পায় না। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা যাতে অন অ্যারাইভাল ভিসার পায়। চীনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এ বিষয়ে একমত হন।

দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে ৯টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়।

এর আগে সকালে চীনের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনারের মাধ্যমে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।

চুক্তি স্বাক্ষর ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিকিয়াং এর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
error: © স্বত্ব ঈশ্বরদী নিউজ টুয়েন্টিফোর