ঢাকা রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০৪:২৫ অপরাহ্ন

ওটির ড্রেস পরে নাচলেন ঢামেকের তিন চিকিৎসক!

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২১
নাচছেন তিন চিকিৎসক

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সার্জারি বিভাগের করিডোর। সেখানে তিন জন চিকিৎসক নাচছেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজছে:

‘আইলারে নয়া দামান আসমানেরও তেরা

বিছানা বিছাইয়া দিলাম শাইল দানের নেড়া

দামান বও, দামান বও

ও দামান খওরে খতা

খাওরে বাটার ফান

যাইবার খতা খও যদি

কাইট্টা রাখমু কান।’

তিন চিকিৎসকের এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছে। চিকিৎসকরা তো বটেই, অন্যান্য পেশাজীবীরাও ভিডিওটি শেয়ার দিয়ে সেখানে চিকিৎসকদের স্যালুট দিচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, ভিডিওটা করেছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্নি চিকিৎসক শ্বাশত চন্দন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। কী মনে করে এই ভিডিও? প্রশ্নে প্রথমেই ডা. চন্দন বলেন, ‘আমি তো বুঝিনি। হঠাৎ করেই মাথায় এলো। কিন্তু এটা এত ভাইরাল হবে, বুঝিনি আমি।’

এরপর তিনি বলেন, ‘করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিককার কথা। কেরালা, তারও আগে বিভিন্ন দেশের চিকিৎসকদের নাচের ভিডিও বের হয়েছিল। তারা রোগীদের, নিজেদের উজ্জীবিত করার জন্য, নিজেদের মানসিক শক্তিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য এই কাজগুলো করতেন। সেগুলো হাজার হাজার, লাখ লাখ শেয়ার হতে দেখেছি, তখন থেকেই মাথায় ছিল এরকম কিছু করা যায় কিনা। এরপর এই নাচের এই ভিডিও। সার্জারি বিভাগের করিডোর এটা, এখানেই ভিডিওটা করা।’

‘তারপরও বিভিন্ন চিন্তা-ভাবনা করে আপলোড করা। কিন্তু এটা যে এত ভাইরাল হবে, সেটা বুঝে আসে নাই’, বলেন চন্দন।

‘ভিডিও আপলোডের পর থেকে অনেক সেলিব্রিটি আমাকে ফেসবুকে রিকোয়েস্ট পাঠাচ্ছেন, আমি তো অভিভূত!’ চন্দনের বিস্ময়মাখা কণ্ঠ টের পাওয়া যায় ফোনের এ প্রান্ত থেকেও।

এটা কবে করেছেন জানতে চাইলে চন্দন বলেন, ‘২৬ এপ্রিল দিনের বেলাতে এই ভিডিও করা হয়। সন্ধ্যার দিকে এডিট করে পোস্ট করলাম। কিন্তু এর যে এত ভিউ হবে, আমার ভাবনাতেও ছিল না।’

ভিডিওতে চন্দনের সঙ্গে আরও দুজন ছিলেন। তাদের মধ্যে চন্দনের বন্ধু ডা. আনিকা ইবনাত শামা আর আরেকজন হচ্ছেন ডা. কৃপা বিশ্বাস। কৃপা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অনারারি মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

ভিডিওটা কি হঠাৎ করেই করা? জানতে চাইলে ডা. শ্বাশত চন্দন বলেন, ‘আমার ইন্টার্নির সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই সপ্তাহটাই সার্জারিতে শেষ সপ্তাহ। সে হিসেবে এই করিডোরে হয়তো আর আসা হবে না। সেই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যেটা কাজ করেছে, তা হচ্ছে-করোনার এই মহামারিতে গত প্রায় দেড়টা বছর ধরেই চিকিৎসকরা সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছেন। অনেক সিনিয়র চিকিৎসক মারা গেছেন, অনেক চিকিৎসকের পরিবারের সদস্য মারা গেছেন। হাজার হাজার চিকিৎসক করোনাতে আক্রান্ত হয়েছেন, কিন্তু তাদের কোনও অ্যাপ্রিসিয়েশন নেই সেভাবে। কাজ করতে করতে চিকিৎসকরা এখন ক্লান্ত। অনেকেই মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। করোনা মানসিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে ফেলে। চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি, চিকিৎসকরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। এসব কিছু ভেবেই এটা করা। এই ভিডিও দেখে কোনও চিকিৎসক যদি একটু প্রফুল্ল হতে পারেন সেটাই আমাদের স্বার্থকতা।’

‘তবে ভিডিওটি আপলোড হওয়ার পর আমার শেয়ার করা ভিডিওতে দেশের পথিকৃত এমন স্যাররা (চিকিৎসক) কমেন্ট করেছেন যেটা আমি কোনোদিনও ভাবিনি। তারা উৎসাহ দিয়েছেন, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন।’ বলেন চন্দন।

নাচের জন্য এই গানটা বেছে নিলেন কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম ইংরেজি গানের সঙ্গে নাচবো। পরে সিদ্ধান্ত বদলে এই লোকগানটি বেছে নিলাম।’

তিন জন মিলে তো নাচলেন, কিন্তু ভিডিও কে করেছেন? জানতে চাইলো উত্তর এলো, ‘আমাদের এক ওয়ার্ডবয়। সে আমাদের চেয়ে বেশি আনন্দিত ছিল এটা নিয়ে।’

শ্বাশত চন্দন নিজের ওয়ালে ভিডিওটি শেয়ার করেছেন সোমবার সন্ধ্যায়। এক মিনিট ১৪ সেকেন্ডের ভিডিওটি একদিনের ব্যবধানে ভিডিওটি তিন হাজারের উপরে শেয়ার হয়েছে আর কমেন্ট করেছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ আর রিঅ্যাক্ট করেছেন প্রায় ৩৪ হাজারের বেশি মানুষ।

তবে কমেন্টগুলো পড়লেই বোঝা যায়, সেখানে চিকিৎসদের সংখ্যাই বেশি। তারা বলছেন, ‘ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের জন্য দোয়া এবং ভালোবাসা।

রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল ফেসবুকে চিকিৎসকদের নাচের এই ভিডিও নিয়ে লেখেন, ‘নৃত্য একটি শক্তিশালী শিল্প। এক মিনিটের নাচও অনেক বড় মানসিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। রক্ষণশীল সমাজকে অনেক বড় ঝাঁকুনিও দিতে পারে। ঢামেকের ফিনিক্স পাখিদের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ সালাম।’

ভিডিওটি শেয়ার করে সাংবাদিক মিথিলা ফারজানা লিখেছেন, ‘দারুন দারুন… ! হাসতে হাসতে হাতে হাত রেখে এই যুদ্ধ আমরা পাড়ি দেবো। মৃত্যুকেও শিখিয়ে দেবো কীভাবে বাঁচতে হয়। সব চিকিৎসাকর্মীর প্রতি ভালোবাসা। আমরাও আছি আপনাদের পাশে।’

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666