ঢাকা বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন

বন্যেরা জনপদে, মানুষ গৃহকোণে

শফিক হাসান
  • প্রকাশিত: শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২০
অলঙ্করণ : মামুন হোসাইন

‘স্বাধীনতা’ শব্দটি মানুষের জন্যই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। মানুষ ধরেই নিয়েছে শব্দটি শুধু তাদের জন্যই প্রযোজ্য। সেই মহাপরাক্রমশালী ‘স্বাধীন’ মানুষ যখন লকডাউনের নামে গৃহবন্দি থাকতে বাধ্য হয়, তখন প্রাণিকুলে হাসির বন্যা বইবে এটাই স্বাভাবিক। জলের কুমির থেকে ডাঙ্গার বাঘ, প্যাঁচা, মুরগি, ইঁদুর, সাপ, কুকুর, কচ্ছপ, শূকর, বানর, বাদুর, খেঁকশিয়াল কেউই বাদ যাচ্ছে না সেলিব্রেশন থেকে!

হনুমান দাঁত খিঁচিয়ে হর্ষধ্বনি দিচ্ছে- কেমন জব্দ! হুক্কা হুয়া রব তুলছে শিয়ালের দল! এই হাসি আরো বাড়ছে টেলিভিশনে দায়িত্বশীলদের বয়ান শুনে। তারা বলেই যাচ্ছেন, সব রকমের প্রস্তুতি আমাদের আছে। কোথাও কোনো ঘাটতি তো নেই-ই, আমেরিকা, চীন, কানাডা, ব্রিটেন আমাদের সাহায্য প্রার্থনা করে ইমেইল পাঠাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত সাহায্য চেয়ে ফোন দিচ্ছেন বারবার!

এরপরও বিশ্বের প্রায় ২০০ দেশে করোনা থাবা বিস্তার করলেও এর সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতা ও প্রতিরোধমূলক সতর্কতা মিলছে খুব কম। উপরন্তু করোনা বাঙালি জীবনযাপনে এনে দিয়েছে ছুটির আমেজ। কবির ভাষায়, পথ হারিয়ে কোন বনে যাই অবস্থা! আমরা যেন আজ সব করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তে চাইছি। কিন্তু পারছি না করোনার কারণে। অথচ এই দুদিন আগেও বাঙালি অদম্য ছিল। মওকা বুঝে চষে বেড়িয়েছে জল স্থল অন্তরীক্ষ। অবশেষে স্বাধীনতা দিবসেই তাদের স্বাধীনতা হরণ হওয়ার উপক্রম! ঘরবন্দি হয়ে ‘স্বাধীনতা’ হারানোর বেদনায় পুড়তে হলো।

যাও-বা ছুটি মিলল কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার সাধ্য নেই। এমনকি কাজ থুয়ে ছুটির মৌজ-মাস্তিতে অবশেষে স্বগৃহে ফিরে যেতে পারলেও দুই আঙুলে ‘ভি সাইন’ তারা দেখাতে পারছেন না। কোয়ারেন্টাইন তাদের জন্য আইন হয়ে এসেছে; তাদেরই জীবন বাঁচাতে। সুতরাং উপেক্ষা করার সাহস হচ্ছে না। ওদিকে মানুষ খাঁচায় থাকলে কেমন দেখায় এই সুযোগে দেখে নিচ্ছে অন্য প্রাণিরা। তারা বলছে, কোথায় গেলো তোমাদের ক্ষমতার বাহাদুরি? দেখলে তো, বন্যেরা জনপদে সুন্দর, মানুষেরা গৃহকোণে!

এদিকে প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে সিলেট ও কিশোরগঞ্জের রেস্তোরাঁয় নোটিশ সাঁটানো হয়েছে: ‘প্রবাসীদের প্রবেশ নিষেধ’। এমন কান্ডে প্রাণিরা হেসেই কূল পাচ্ছে না। খাঁচাবন্দি এক আড়তদার কাম মজুদদারকে দেখে হি হি হি করে হাসছে আজ বিষধর সাপ। হারামজাদা নামেই মানুষ, আসলে ভয়ঙ্কর জন্তু! মজুদদার নিজে সুরক্ষিত থাকলেও তার বাণিজ্য চলছে পুরোদমে। ঘরে বসে কর্মচারীদের দিয়ে ছক কাটছে কীভাবে দাম আরো বাড়িয়ে ক্রেতাদের পকেট কাটা যায়!

প্যাঁচা কিছুতেই বুঝতে পারে না, কেন তাদের অশুভের প্রতীক বিবেচনা করা হয়। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে রাষ্ট্রের সমূহ সর্বনাশ করা ঘুষখোর, সুদখোর, দুর্নীতিবাজদের। ধর্ষক কিংবা চোর-ডাকাত এদের বিবেচনায় প্যাঁচা আর কতটাই বা অশুভ। মানবজাতির এমন দুর্দিনেও এরা তৎপর লাভের খোঁজে। একেই বুঝি বলে- কারো সর্বনাশ, কারো পৌষ মাস। অনেকে আছেন, আসন্ন বৈশাখ উপলক্ষে কোন পণ্য বাজারজাত করে ফায়দা লুটবেন সেই চিন্তায়। অথচ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে চিকিৎসক ও চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে।

এর মধ্যে কর্তা ব্যক্তিদের বাচালতা বিপাকে ফেলেছে স্বয়ং রাষ্ট্রকেই। অব্যবস্থাপনা কিছুতেই আর চেপে রাখা যাচ্ছে না। করোনা সব বুঝি আজ উলঙ্গ করে দেখিয়ে দিচ্ছে মানুষ, মানবসভ্যতা কত অসহায়। করোনা মানছে না জাত-পাত, ধর্ম বিচার। এ অবস্থায় গৃহপালিত মুরগিও একপ্রকার নির্বাক। বেশি ‘কক্ কক্’ করে বলে বদনাম যে তাদেরই বেশি!

পৃথিবী আবার তাদের আয়ত্বে আসছে, প্রাণিরাজ্য প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত পেয়ে বানর নেচে নেচে ভেঙচি কাটছে। এক নেতার আলিশান বাড়ির সামনে এসে সে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। ভেতর থেকে ভেসে আসছে ফিসফাস ষড়যন্ত্রের আভাস। করোনায় বরাদ্দ দেবে সরকার, তার বরাদ্দ কত? আহ্ বেচারা বুঝতেও পারছে না, আগামীকাল সে সুস্থ থাকবে কিনা- তারই তো ঠিক নেই। অথচ সম্পদ বাড়াতে মানুষের কত কায়দা! বেঁচে থাকার কত আয়োজন!

বেঁচে থাকাটা না হয় অধিকার, কিন্তু অন্যকে বঞ্চিত করে নিজের সম্পদ বাড়ানোর কথা একমাত্র মানুষই ভাবতে পারে। এমনকি এই কোয়ারেন্টাইনে থেকেও!

কুমির বরাবরই বিব্রত হয় ‘টাকার কুমির’ অভিধায়। টাকা দিয়ে কী করবে তারা! মানুষ নানা কায়দায় অর্থকড়ি উপার্জন করেই না টাকার কুমির হয়। অনেকদিন থেকেই সে মানুষকে জব্দ করার উপায় খুঁজছিল। আজ পেয়েছে সেই সুযোগ। মানুষ আজ স্বেচ্ছাবন্দি জানতে পেরে কুম্ভিরাশ্রু ভুলে সে আজ কুম্ভিহাসি হাসছে। পরিস্থিতি দেখতে সে উঠে এসেছে ডাঙ্গায়। খোলা মাঠে তার সঙ্গে দেখা হয় ইঁদুর, কুকুর, কচ্ছপ, শূকর, বাদুরের। তারা গুরুগম্ভীর আলোচনায় ব্যস্ত। কুমিরকে দেখে সাদর সম্ভাষণ জানায়। কুমির হেসে বলে, দেখলে তো ভায়ারা, যেটা আমরা পারিনি, সেটাই করে দেখিয়েছে করোনা। চীনকে ধন্যবাদ দাও। ভবিষ্যৎ পৃথিবী হবে আমাদের, আর চীন হবে সুপার পাওয়ার; আমেরিকার দিন শেষ হয়ে এলো বলে!

কুকুরই একমাত্র দীর্ঘশ^াস ফেলে বলে, মনিব যদি না থাকে, এমন পৃথিবী দিয়ে কী করবো? ইঁদুর বিরক্তি ঝাড়ে, তোমার প্রভুভক্তি আর গেলো না হে! এখন আবার শুরু করেছো টকশো। কচ্ছপ পাল্টা উত্তর দেয়, মানুষ যদি চাষাবাদের সুযোগ না পায়, কার ধান চুরি করবে? প্রকৃতিপ্রেমীরা গাছ না লাগালে বই কাটবে কীভাবে? বাদুর বলে, পৃথিবী গভীর সংকটে। সাধারণ মানুষ এবং আমাদের ক্ষোভ অসৎদের বিরুদ্ধে। পৃথিবীবাসী তো কারো ক্ষতি করেনি। বরং তারাই কত সুন্দর করে এসব সাজিয়েছে। তাকিয়ে দেখ, চারপাশে সবই তো মানুষের সৃষ্টি। তারাই যদি না থাকে এসবের রক্ষণাবেক্ষণ করবে কে? অমূল্য সম্পদ ভালোবাসাই বা কোথায় মিলবে?

এবার সবাই একটু একটু করে বুঝতে পারে। কেঁপে ওঠে অজানা আশঙ্কায়। কুমির বলে, আমরা কোনো অপরাধ করিনি। চলো, সবাই মিলে পৃথিবী রক্ষার জন্য প্রকৃতির কাছে ক্ষমা চাই। মানুষেরও উচিত যারা এই প্রকৃতি ধ্বংস করেছে ক্ষমা চাওয়া, নিজেদের শোধরানোর শপথ নেওয়া।

একের পর এক আসে বনের সব পশুপাখি। বসে সম্মিলিত প্রার্থনাসভা। করোনা মহামারি থেকে মুক্তি পেতে অদৃশ্য শক্তির কাছে পরিত্রাণ চায় তারা।

প্রার্থনাসভার অদূরে লোকালয়ে তখন চলছে ফেসবুক বিপ্লব। লাখো-কোটি স্ট্যাটাস:

সরকার ওইডা করলো না ক্যান?

চীন কেন এখনো সাপ-বেজি খায়?

খালেদা জিয়াকে আরো আগে মুক্তি দিলো না কেন?

করোনায় আমার কিচ্ছু অইবো না, আমি পীরের মুরিদ!

আজকাল বাধ্যতামূলক রান্না করতে হচ্ছে; পুরুষবাদীরা কোথায়!

সীমান্ত কতদিন বন্ধ থাকবে, চোরাকারবারিরা অলস বসে থাকবে নাকি!

১ জিবি ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনলেই পাচ্ছেন ১০ জিবি ফ্রি…। আপনি জানেন এটা সত্যি না গুজব?

এমন বিপদের দিনে একমাত্র মানুষই পারে গুজব রটিয়ে ফায়দা তুলতে।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২০
 
themebaishwardin3435666