ঢাকা রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২০, ০৫:২৩ অপরাহ্ন

নারী স্বাধীনতা আসলে কী?

আনিকা তাসনিম সুপ্তি
  • প্রকাশিত: রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২০
আনিকা তাসনিম সুপ্তি

নারী স্বাধীনতা আসলে কী? এই প্রশ্নটি যদি জনসম্মুখে করা হয়, তাহলে বিজ্ঞজনদের ধাক্কায় দাঁড়িয়ে থাকা দায় হবে। নারী অধিকার নিয়ে, নারী স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার লোকের অভাব হয় না। তাহলে অভাবটা কিসের?

অভাব হচ্ছে উপলব্ধিতে। নারী স্বাধীনতা যে কী, তা উপলব্ধি করার মানুষের বড় অভাব। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি, বর্তমান সমাজে দুই ধরনের জনগোষ্ঠী খুব তৎপর। এক ধরনের জনগোষ্ঠী উগ্রতার দোহাই দিয়ে নারী স্বাধীনতাকে কৌশলে ধ্বংস করার চেষ্টায় মত্ত। আরেক ধরনের জনগোষ্ঠী নারী স্বাধীনতার আড়ালে উগ্রতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত। নারী স্বাধীনতা মানে উগ্রতা নয়। তাই নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হোন, উগ্রতায় নয়।

আমি বুঝি নারী স্বাধীনতা অর্থ হলো, নারীর নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিজের সুস্থ চিন্তার সঠিক বাস্তবায়ন করতে পারা। বিষয়ের জটিলে না গিয়ে নারীবাদ নিয়ে একটা কথা না বললেই নয়। নারীবাদের সৃষ্টি নারীকে পুরুষের মর্যাদায় তুলে আনার জন্য বা নারী পুরুষের সমান অধিকারের দাবিতে এবং নারীর প্রতি শারীরিক ও মানসিক অপরাধ কমানোর লক্ষ্যে। কিন্তু নারীবাদী চেতনার মধ্যে দিনের পর দিন ধীর গতিতে স্থান করে নিয়েছে একটি শরীরকেন্দ্রিক চেতনা, যা নারীকে আবার শরীরমাত্র করে তুলছে। কৌশলে অসম্ভব করে তুলছে নারীর সত্যিকারের স্বাধীনতার সম্ভাবনাকে।

বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কিছু মানুষ গলা উঁচু করে নির্দ্বিধায় নারী স্বাধীনতার কথা বলেন, নারীদের এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। এই যে গলা উঁচু করে ভাষণ দেওয়া জনগোষ্ঠী, তাদের কী বিশ্বাস! দিনশেষে তারাই যে নারী স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বুঝতে ব্যর্থ। সবচেয়ে দুঃখজনক, এটাই যে সেই লোক দেখানো বড় বড় কথা বলা গোষ্ঠীই হয়তো ঘরে ফিরে নিজের স্ত্রী-সন্তানকে কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টায় থাকেন।

একজন নারীর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে গভীর দৃষ্টিতে চিন্তা করলে পরিষ্কারভাবে ওঠে আসবে নারীর জীবন কতটা ভয়াবহ। এই ভয়াবহতার পেছনে যে কেবল পুরুষ সমাজ দায়ী তা নয়, বরং নারী ও পুরুষ সমানভাবে দায়ী।

আমরা কথায় কথায় পুরুষের দোষ খুঁজে বেড়াই, কিন্তু নিজেদের দুর্বলতাগুলো নিয়ে কখনোই মুখ খুলি না। নারীবাদী হতে গিয়ে, আমরা অনেকটাই পুরুষ বিদ্বেষী হয়ে উঠেছি, যা আসলে আমাদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতে শেখায়। কিন্তু নারীরা যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে শেখে, নিজের জায়গাটা নিজে চিনে নিতে শেখে, পুরুষের সাধ্য নেই নারীকে আটকানোর।

নারীকে নিজের পরিবার থেকেই প্রথমত পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে অন্য পরিবারে গিয়েও নারী সেই শিকলে আবদ্ধ থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ভালো লাগুক আর না লাগুক সবকিছুকে সায় দিতে হয় তাকে। নারীর সাথে অন্যায় হলেও পরিস্থিতির কারণে মুখ বুজে সহ্য করে নিতে হয়। এর বড় একটা কারণ নারীরা আর্থিকভাবে অসচ্ছল। দুর্বল জায়গায় আঘাত করা মানুষের আজন্ম স্বভাব। অনেক নারী আবার অধিকার আদায়ে কিছুটা সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তাদেরকে দমানোর চেষ্টায় পুরো সমাজ যেন উঠেপড়ে লাগে! আপনজনদের কাছ থেকে মুখস্থ বুলির মতো নারী শোনে মানিয়ে নেওয়ার কথা! এই যে অত্যাচারের শিকার হচ্ছে, এ যেন নারীর দোষ।

আরেকটি মজার বিষয় হলো, সন্তান উৎপাদনের জন্য গর্ভ ধারণের মতো বিষয়টিকে সকল সমাজেই নারীর অসুস্থতা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটাকে একটা লজ্জার বিষয় বলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখনো, আমাদের দেশে কোনো মেয়ে গর্ভবতী হলে তার আত্মীয়-স্বজনরা লুকিয়ে লুকিয়ে, কানে কানে খবর দেয় যে অমুক অসুস্থ।

গর্ভবতী নারীকেও চাপে রাখা হয় গর্ভধারণের কথা সহজে প্রকাশ না করতে। যেন গর্ভধারণ করে মেয়েটি এক লজ্জাজনক অপরাধ করে ফেলেছে। সেই আত্নীয়-স্বজনদের মধ্যে নারী আত্মীয়রা রয়েছে উপরের কাতারে। অথচ মানবসমাজে গর্ভধারণ করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তার একচ্ছত্র আধিপত্য শুধু নারীর। দুঃখের বিষয়, এই যে নারীরাও এই সত্য উপলব্ধিকরণে এখনো ব্যর্থ।

নারীকে বলা হয় মায়ের জাত। এই কথাটার পরিপ্রেক্ষিতে আছে নারীকে সম্মান দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে এই ‘মায়ের জাত’ শব্দটিকে পুঁজি করেও নারীকে কোণঠাসা করার চেষ্টা দেখেছি।

বেঁচে থাকার প্রয়োজনে নারীকে বিভিন্ন সম্পর্কের নারী হয়ে যেতে হয়, কিন্তু আলাদা করে সে কোনো জাত নয়। সে কেবলি একজন নারী, একজন মানুষ। এখনো অনেক নারী এবং পুরুষও মনে করেন নারীবিষয়ক যেকোনো আলোচনা অশ্লীল, বিতর্কিত। নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলাও এই অশ্লীল, বিতর্কের অংশ।

এ রকম ধারণা থেকে বের হয়ে আসা সবচেয়ে জরুরি৷ মন-মানসিকতা স্বচ্ছ না হলে যতই আন্দোলন আর সভা-সমাবেশ হোক না কেন, গলা ফাটিয়ে যতই নারী স্বাধীনতার কথা বলা হোক না কেন, দিন শেষে ফলাফল শূন্যই থাকবে।

মন-মানসিকতা স্বচ্ছ করার প্রয়োজনীয়তা শুধু পুরুষের নয়, নারীরও। নারীর বুঝতে হবে, নারী স্বাধীনতা মানেই স্বেচ্ছাচারিতা নয়। নিজের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সবকিছুকে অগ্রাহ্য করতে হবে এমন নয়, তবে সামনে বাধা আসবেই, তা ভেবে প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় নারীকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। নারীকে নারীর মতো করেই বাঁচতে দেওয়া উচিৎ। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, নারীর প্রথম পরিচয় হচ্ছে সে মানুষ। অন্য সব মানুষের মতো নারীও নিজের ইচ্ছের, পছন্দের, ভালোবাসার সিদ্ধান্তের মানুষ।

জনৈক নারী বলেছিলেন, ‘আমি নারী, আমি হৃদয় দিয়ে বিশ্ব জয় করবো’। হ্যাঁ উগ্রতা দিয়ে নয়, স্বেচ্ছাচারিতা দিয়ে নয়। নারীর আছে হৃদয়, নারী সেই হৃদয় দিয়েই বিশ্বজয় করবে। আর এই হৃদয়ের কারণেই নারীকে আটকানোর সাধ্যও কারো নেই। আমি মনে করি প্রতিটা দিনই নারীদের। তাদের নিজেদেরই নিজেদের মতো করে নিজেদের দিন সাজিয়ে নিতে হবে। নারী দিবসে প্রতিটি নারীর প্রতি রইলো শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।

লেখক: শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ (৩য় বর্ষ), কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২০
 
themebaishwardin3435666