ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ০৩:২৮ পূর্বাহ্ন

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে লটারি ছাড়াই ৭০ লাখ টাকার কাজ ভাগ-বাটোয়ারা!

নাটোর প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২০
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড।

নাটোরের লালপুর উপজেলার নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ৭০ লাখ টাকার কাজ টেন্ডার লটারি ছাড়াই ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অংশগ্রহণকারী অন্য ঠিকাদাররা।

তাদের অভিযোগ ওটিএম (খোলা ডাক) পদ্ধতিতে আহ্বানকৃত সাতটি কাজের একটি টেন্ডার প্যাকেজের ৭০ লাখ টাকার ওই কাজ টেন্ডার লটারির পরিবর্তে চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল কাদের ও স্থানীয় সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বকুলের অনুসারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। টেন্ডারে লটারি না হওয়ায় কবে কাজ ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে তাও তারা জানেন না বলে জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারী অন্য ঠিকাদাররা।

তারা বলেন, হঠাৎ করেই চিনিকল কর্তৃপক্ষ লটারির দিন উপস্থিতির স্বাক্ষরপত্রে স্বাক্ষর নিতে এলে জানতে পারেন কাজগুলো ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে গেছে।

এদিকে মিল কর্তৃপক্ষের দাবি, যথাসময়ে এবং সব নিয়মনীতি মেনেই টেন্ডার হয়েছে। এ অভিযোগ সত্য নয়। তাই কারো কাছ থেকে স্বাক্ষর আদায়ের প্রশ্নই আসে না।

এদিকে নর্থ বেঙ্গল চিনিকল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারি দুইটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র আহ্বান করেন চিনিকলের পুরাকৌশল বিভাগের ব্যবস্থাপক আবু সালেহ।

বিজ্ঞপ্তিতে চিনিকলের নিরাপত্তা অফিস থেকে সাধারণ ভান্ডার পর্যন্ত রাস্তা, স্পেস মাট ইয়ার্ড থেকে স্প্রে পণ্ড মোটর পর্যন্ত রাস্তা, মিল মন্দিরের রাস্তা, অফিস কলোনির এপ্রোচ রাস্তার বিটুমিন কার্পের্টিং, কারখানার অভ্যন্তরের রাস্তা আরসিসিকরণ, ইক্ষু হিসাব ও নির্মাণ শাখার অফিস মেরামত, ব্যাগিং হাউস ও ইন্টারমিডিয়ের গোডাউন সিসিঢালাই, ব্যাগাস ইয়ার্ড উন্নয়নকরণ, স্প্রে পণ্ড মোটরের ঘর সংস্কার ও বড়াল খামারের গয়লার ঘোপ এলাকার একটি রাস্তা এইচবিবিকরণ কাজগুলোর সাতটি ভাগে ভাগ করে প্রতিটি ৫০০ টাকা মূল্যের দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব কাজের জন্য বরাদ্দ করা হয় ৭০ লাখ টাকা।

অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারের অভিযোগ, করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় এ অনিয়ম করা হয়েছে। তাই ভাগ-বাটোয়ারার কার্যাদেশ বাতিল করে প্রকাশ্য লটারির মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী বৈশাখী এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী শান্ত হোসেন বলেন, টেন্ডার কবে হয়েছে তা জানতেই পারিনি। হঠাৎ শুনি কাজ ভাগাভাগি হয়ে গেছে। যারা দরপত্র কিনেছিলেন তাদের অনেকেই জানতেন না কবে টেন্ডার হয়েছে। একটি তারিখে টেন্ডারের লটারি অনুষ্ঠিত দেখিয়ে অংশগ্রহণকারী অনেকের উপস্থিতির স্বাক্ষর নিতে শুনেছি।

এ কে এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী আবুল কাশেম বলেন, ‘টেন্ডারের দিন আমি উপস্থিত ছিলাম, এই মর্মে মিল কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকদিন ধরে আমার স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুরে তাদের আমি স্বাক্ষর দিতে বাধ্য হয়েছি। স্বাক্ষর নিতে এসে একজন জনপ্রতিনিধির ফোন ধরিয়ে দেয় আমাকে, তাই স্বাক্ষর না দিয়ে উপায় ছিলো না।’

ন্যাশনাল কনসাল্টেন্সির সত্ত্বাধিকারী খন্দকার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ট্রেন্ডার কবে হয়েছে জানতে পারিনি। শুধু জেনেছি কাজ ভাগ হয়ে গেছে। মিল কর্তৃপক্ষ টেন্ডারে উপস্থিতির স্বাক্ষর নিতে দরপত্রে অংশগ্রহণকারীদের বাড়ি বাড়ি ধর্ণা দিচ্ছে এখন।’

চিনিকল সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, সদ্য সাবেক এমডি আব্দুল কাদের নিয়ম বহির্ভুতভাবে সর্বশেষ টেন্ডার প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করেন। তিনি শ্রমিকদের স্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থে চিনিকলটি ব্যবহার করে গেছেন। গত মৌসুমেও তার বিরুদ্ধে প্রায় ৩ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ছিলো। তার বিরুদ্ধে তদন্ত করেও গেছে করপোরেশন প্রতিনিধিরা।

লালপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইসাহাক আলী বলেন, সাবেক এমডি আব্দুল কাদেরকে যারা বিভিন্ন অনৈতিক কাজে সমর্থন দিতেন, যারা স্থানীয় সংসদ সদস্যের সমর্থক সেসব অনুগতদেরই এই টেন্ডারের কার্যাদেশ দিয়েছেন তিনি। তিনি ইচ্চাকৃতভাবে টেন্ডারে বিলম্ব করেছেন। পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি সদ্য অবসরগ্রহণ করেছেন বলে অনিয়মের দায় থেকে যেনো মুক্তি না পান সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণে করপোরেশনকে অনুরোধ করছি।

অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে আব্দুল কাদেরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

চিনিকলের প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম  বলেন, তিন মাস আগের টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন তোলার মধ্যে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে। এতোদিন কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। টেন্ডার আহবান থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়ম মাফিক হয়েছে। লটারির মাধ্যমেই নিম্নদরদাতারা নির্বাচিত হয়েছেন। প্রায় ১৫ জন ঠিকাদারের উপস্থিতিতে লটারি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

অন্যরা লটারি করার সময় উপস্থিত ছিলেন না। কাজ ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (জিএম) হুমায়ুন কবীর  বলেন, আমি দুদিন হলো দায়িত্ব নিয়েছি। টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে উপস্থিতির প্রমাণস্বরূপ স্বাক্ষর আদায় করা হয়েছে কি না, তা জানা নেই। এখনও কেউ এমন অভিযোগ করেনি। চিনি কলটি লাভজনক করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা হবে। কোনো অনিয়মের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বকুলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো সাড়া দেননি।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২০
 
themebaishwardin3435666