ঢাকা রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০৮:০১ পূর্বাহ্ন

ইতিকাফের ফজিলত ও বিবিধ প্রসঙ্গ

মুফতী নাসরুল আমীন সিরাজী, অতিথি লেখক | ঈশ্বরদীনিউজটোয়েন্টিফোর.নেট
  • প্রকাশিত: রবিবার, ২৬ মে, ২০১৯
মদিনা মুনাওয়ারার মসজিদে নববী। ছবি: সংগৃহীত

ইতিকাফ অর্থ স্থির থাকা, অবস্থান করা। শরিয়তের পরিভাষায় জাগতিক কার্যকলাপ ও পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সওয়াবের নিয়তে মসজিদ বা ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবস্থান বা স্হির থাকাকে ইতিকাফ বলে।

ইতিকাফের হুকুম

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কেফায়া। অর্থাৎ বড় গ্রাম বা শহরের প্রত্যেকটা মহল্লা এবং ছোট গ্রাম-এলাকার পূর্ণ বসতিতে কেউ কেউ ইতিকাফ করলে সকলেই দায়িত্ব মুক্ত হয়ে যাবে। আর কেউই না করলে সবাই গোনহগার হবে।

ইতিকাফের সময়

ইতিকাফের সময় হলো রমজানের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত। এই ইতিকাফ মহিলারাও ঘরের কোলাহল মুক্ত নামাজের স্থানে করতে পরবে। আর বিবাহিতা নারীরা স্বামীর অনুমতি নিয়ে ইতিকাফে বসবে।

মহান আল্লাহ পাক হযরত ইবরাহিম (আ.) এবং হযরত ঈসমাইল (আ.) এর কথা উল্লেখ করে ইরশাদ করেন ‘আর আমি ইবরাহিম ও ঈসমাইলকে আদেশ করলাম’ তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৫)

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) প্রতি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফে কাটান। ( বুখারি, হাদিস নং: ১৯০৩)

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘ইন্তেকাল পর্যন্ত রাসুল (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন, এর পর তার স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন।’ (বুখারি, হাদিস নং: ১৮৬৮; মুসলিম, হাদিস নং: ২০০৬)

রাসুল (সা.) বলেন, আমি কদরের রাতের তালাশে প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম, এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন, অতপর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানানো হলো যে, তা শেষ ১০ দিনে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইতিকাফ পছন্দ করে, সে যেন ইতিকাফে বসে। (মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৯৪)

ইতিকাফের ফজিলত

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ইতিকাফকারী যাবতীয় গোনাহ থেকে মুক্ত থাকে এবং তার জন্য ওই পরিমাণ নেকি লেখা হয়, যে পরিমাণ আমলকারীর জন্য লেখা হয়ে থাকে। (মিশকাত, হাদিস নং: ২০০৪)

আল্লামা শারানি (রহ.) রাসুল (সা.) এর ইরশাদ নকল করেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে ১০ দিন ইতিকাফ করবে, সে দুই হজ ও দুই ওমরার সওয়াব পাবে। (কাশফুল গুম্মাহ ও বাইহাকি)

ইতিকাফের বিবিধ উপকারিতা

ইতিকাফ একটি মহান ইবাদত। মদিনায় অবস্থান কালে রাসুল (সা.) প্রতি বছরই ইতিকাফ পালন করেছেন। দাওয়াত, তরবিয়াত, শিক্ষা ও যুদ্ধ-সংগ্রামে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও রমজানে তিনি ইতিকাফ ছাড়েননি।

ইতিকাফ ঈমানী তরবিয়তের একটি পাঠশালা ও কোর্স। ইতিকাফরত অবস্থায় বান্দা নিজেকে আল্লাহ্‌র ইবাদতের জন্য দুনিয়ার অন্য সব বিষয় থেকে আলাদা করে নেয়। ঐকান্তিকভাবে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিরন্তর সাধনায় মশগুল হয়ে পড়ে।

ইতিকাফ ঈমান বৃদ্বির একটি মুখ্য সুযোগ। সবার উচিত এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের ঈমানি চেতনাকে শানিত করে তোলা এবং উন্নততর পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা। তাছাড়া এই ইতিকাফের মাধ্যমে ‘শবে কদর’ পাওয়ার এক অপূর্ব নিশ্চিত সুযোগ রয়েছে। কারণ হাদিসের ভাষ্যমতে রমজানের শেষ দশকে ‘শবে কদর’ হওয়া অনেকটাই নিশ্চিত। আর ইতিকাফ এটাও রমযানের শেষ দশকে হয়ে থাকে বিধায়. এ কথা জোরালোভাবেই বলা যায়, যে ইতিকাফ করলো সে যেন নিশ্চিত ‘শবে কদর’ পেয়ে গেলে!

পরিবার-পরিজন, ব্যবসা-চাকরিসহ, দুনিয়াবী সমস্ত কার্যকলাপ থেকে মুক্ত হয়ে পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট স্থান মসজিদে পূর্ণ দশ দিনের জন্য সর্ব মহৎ স্বত্ত্বার সান্নিধ্য লাভের প্রচেষ্টা—এটা নিশ্চিত স্রষ্টা ও সৃষ্টির বন্ধনকে করে আরো মজবুত, যা সবার পক্ষে হয়ে উঠে না। এই অপার্থিব ও ঐশ্বরিক ভালোবাসার চুম্বুকাকর্ষণে সেই কেবল আকর্ষিত হতে পারে, যাকে আল্লাহ ‘মুখলিস’ বা নিষ্ঠাবান বান্দা হিসেবে কুবল করে নিয়েছেন।

এই ইতিকাফর ফলে আল্লাহর জন্য মস্তক অবনত করার প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠে। কেননা ইবাদতের বিবিধ প্রতিফলন ঘটে ইতিকাফ অবস্থায়। ইতিকাফ অবস্থায় একজন মানুষ নিজেকে পুরোপরি আল্লাহর ইবাদতের সীমানায় বেঁধে নেয় এবং আল্লাহর সন্তষ্টি কামনায় ব্যাকুল হয়ে পড়ে!

তাছাড়া এই ইতিকাফের মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে নেয়ার কারনে মুসলমানের অন্তরের কঠোরতা দুরিভূত হয়। কেননা কঠোরতা সৃষ্টি হয় দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ও পার্থিবতায় নিজেকে আরোপিত করার কারণে। আর মসজিদে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখার কারণে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসায় ছেদ পড়ে এবং আত্মিক উন্নতির অভিজ্ঞতা অনুভূত হয়।

ইতিকাফের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি আসে। বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াতের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ঐকান্তিকভাবে তওবা করার সুযোগ লাভ হয়। সর্বোপরি সময়কে সুন্দরভাবে কাজে লাগানোর এক যোগ্যতা তৈরি হয়। তাই ইতিকাফকে বলা চলে, দশ দিন মেয়াদি আধ্যাত্মিক উন্নতির সাধনার এক পবিত্রতম সোপান!

রমজানবিষয়ক যেকোনো লেখা আপনিও দিতে পারেন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন: bn24.islam@gmail.com

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666