ঢাকা শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৩২ অপরাহ্ন

ঈশ্বরদী উপজেলায় এত বিয়ে বিচ্ছেদ!

সেলিম সরদার
  • প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৯

ঈশ্বরদীতে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে বিয়ে বিচ্ছেদ। প্রায় প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কোনো না কোনো পরিবারে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর নির্যাতন সহ্য করে আসা নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার পর আর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চাইছেন না। এ ছাড়া বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দাম্পত্য কলহ, স্বামী বা স্ত্রীর পরকীয়া, স্বামীর মাদকাসক্ততাও সংসার ভাঙার অন্যতম কারণ।

ঈশ্বরদী পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন পরিষদ, বিভিন্ন নিকাহ রেজিস্ট্রার ও আইনজীবীর মাধ্যমে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে ঈশ্বরদীর অন্তত ১০০টি পরিবারে বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। আরও অর্ধশতাধিক নারী তাদের স্বামীকে তালাক দেওয়ার জন্য বিভিন্ন নিকাহ রেজিস্ট্রার ও আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিত আবেদন করেছেন।

নারীরা নির্যাতন সহ্য করে এলেও সাধারণত বিয়ে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত তাদের নিতে দেখা যায় না। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় স্বামীর হাতে দিনের পর দিন নির্যাতনের বিপরীতে পরিবার কিংবা সমাজ থেকে ওই নারীকেই ধৈর্য ধরে সংসার করতে বলা হয়। যদিও দাম্পত্য কলহের পরিপ্রেক্ষিতে নারীরও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। ঈশ্বরদীর নারীদের এই ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে কী বলছেন মানবাধিকার কর্মী, সমাজকর্মীসহ সংশ্নিষ্টরা? তাদের মতে, নারীরা এখন অনেক সাহসী ও অধিকার সচেতন। তারাও  চাকরি করে আয় করছেন। ফলে সংসারে স্বামীর অন্যায়-নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শুরু করেছেন কর্মজীবী এই নারীরা। বিয়ে বিচ্ছেদ যার চূড়ান্ত রূপ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তালাক দেওয়া নারীরা ঈশ্বরদী ইপিজেডসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দু-একজন বাদে তালাক দেওয়াদের মধ্যে সবাই নারী।

বিয়ে বিচ্ছেদ সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ঈশ্বরদী ইপিজেড এলাকার পাকশী ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায়। পাকশী ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র জানায়, এই ইউনিয়নে এ বছরই সবচেয়ে বেশি বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর যেখানে এ ইউনিয়নে ছয়টি বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছিল, সেখানে এ বছরে মাত্র এক মাসে ঘটেছে ১৪ জনের বিয়ে বিচ্ছেদ। একইভাবে উপজেলার মুলাডুলি, সাঁড়া, দাশুড়িয়া, সলিমপুর, লক্ষ্মীকুণ্ডা, সাহাপুর ও ঈশ্বরদী পৌরসভা এলাকার গত তিন বছরের হিসাব অনুযায়ী, সারাবছর যেখানে পাঁচ-সাতটি পরিবারের বিয়ে বিচ্ছেদের নোটিশ আদালত থেকে আসত, সেখানে এ বছর প্রতি মাসেই পাঁচ থেকে শুরু করে ২০টি পর্যন্ত বিয়ে বিচ্ছেদ নিয়ে সালিশ বৈঠক হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদগুলোয়।

পাকশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হক বিশ্বাস এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, চলতি বছর বিয়ে বিচ্ছেদের সালিশ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

ঈশ্বরদীর বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত এক মাসে উপজেলার সাঁড়া ইউনিয়নে সাত, মুলাডুলি ইউনিয়নে ১১, সলিমপুর ইউনিয়নে আট, দাশুড়িয়া ইউনিয়নে সাত, লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নে পাঁচ, সাহাপুর ইউনিয়নে আট এবং পাকশী ইউনিয়নে সর্বোচ্চ ১৪ ও ঈশ্বরদী পৌর এলাকায় ৩৫ পরিবারসহ অন্তত ১০০টি পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে।

ঈশ্বরদীর বাঘইল গ্রামের এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইপিজেডে চাকরি করে বাড়ি ফিরে যদি স্বামীর অত্যাচার সইতে হয়, তার চেয়ে একা থাকাই ভালো। তাই স্বামীকে তালাক দিয়ে স্বাধীন জীবনযাপন করছি, ভালোই আছি।

মুলাডুলি গ্রামের এক নারী বলেন, নিজে চাকরি করি, অথচ স্বামী বেকার। তারপরও স্বামী আমার উপার্জিত পয়সায় মাদক সেবন করে আমার ওপরই শারীরিক নির্যাতন চালাত। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে স্বামীকে তালাক দিয়ে দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে জীবনযাপন করছি। আরও কয়েক নারীর সঙ্গে কথা বললে তারাও প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েক নারীর সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তারা বলেন, স্বাধীন ও সুস্থ জীবনযাপন করার অধিকার সবারই আছে। কিন্তু অনেক স্বামীই তাদের স্ত্রীদের স্বাধীনতা খর্ব করার পাশাপাশি বিনা কারণে জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলেন। সে ক্ষেত্রে স্ত্রীদের বা নারীদেরও তো তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। অনেক নারীই হয়তো স্বামীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে এসব নির্যাতন দিনের পর দিন সহ্য করে যান। কিন্তু যখন নারীরা স্বাবলম্বী হন, তখন তারা এসব নির্যাতন থেকে রেহাই পাওয়ার পথ খুঁজে পান। সংসারে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার আহ্বান জানান তারা।

সংশ্নিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জেলা জজ আদালতের শিক্ষানবিশ আইনজীবী আলী আজম জানান, ঈশ্বরদীর ওইসব ইউনিয়ন থেকে বিয়ে বিচ্ছেদের আরও অর্ধশতাধিক আবেদন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।

পাকশী ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মিজানুর রহমান খোকন জানান, তালাক দেওয়া নারীদের প্রায় সবাই ঈশ্বরদী ইপিজেডের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত। তারা বিভিন্নভাবে স্বামীর নির্যাতনের শিকার অথবা দাম্পত্য কলহের কারণে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন।

ঈশ্বরদী পৌর এলাকার সাঁড়াগোপালপুরে বিয়ে বিচ্ছেদ নিয়ে বেশ কয়েকটি বিচারে উপস্থিত থাকা সমাজকর্মী রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, আগের চেয়ে নারীরা এখন অনেক সাহসী, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। আয়-রোজগার করেও তারা এখন স্বাবলম্বী। এসব কারণে নারীরা আর ভয় পান না। এগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। প্রায় একই মন্তব্য করেন জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মোখলেছুর রহমান।

মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা ঈশ্বরদী উপজেলা শাখার সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান ফান্টু বলেন, দাম্পত্য কলহ নিয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের কাছে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই আসেন। আমরা চেষ্টা করি, সংসারটা টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বনিবনা না হওয়ায় বিয়ে বিচ্ছেদের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা।

ঈশ্বরদী পৌরসভার প্যানেল মেয়র (২) ও সংরক্ষিত ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ইপিজেডসহ এ অঞ্চলে নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় আগের দিনের মতো কেউ আর মুখ বুজে সবকিছু সহ্য করছেন না। দাম্পত্য কলহের জেরে এসব চাকরিজীবী নারী খুব সহজেই স্বামীকে তালাক দিয়ে দিচ্ছেন।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
%d bloggers like this: