ঢাকা শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ০৩:৫৫ পূর্বাহ্ন

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ব্যতিক্রমি ফেরিওয়ালা ঈশ্বরদীর রফিকুল

দাশুড়িয়া থেকে আকাশ খান
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৯
বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ব্যতিক্রমি ফেরিওয়ালা রফিকুলের বক্তব্য শুনছে সাধারণ মানুষ। বৃহস্পতিবার (১৫ আগস্ট) সকালে ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া গোলচত্বর এলাকা থেকে তোলা ছবি।

পাবনা-ঈশ্বরদী মহাসড়কের দাশুড়িয়া মোড়। অটোরিক্সা স্ট্যান্ডে ছোটখাট জটলা দেখে এগিয়ে যেতেই কানে ভেসে এল ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ’। কৌতুহলি মনে আর একটু এগোতেই দেখি, শক্ত পোক্ত শরীরের দীর্ঘদেহী এক যুবক তর্জনি উঁচিয়ে ভরাট কন্ঠে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ দিচ্ছেন। ব্যাপারটা জানার চেষ্টা করতেই উৎসুক শ্রোতাদের একজন জানালেন, যুবকের নাম রফিকুল ইসলাম। দাশুড়িয়া স্ট্যান্ডের সিএনজি অটোরিকশা চালক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্ধভক্ত। বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই দৃপ্ত উচ্চারণে, উচ্চ কন্ঠে রফিকুল বলে উঠলেন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার মহাকাব্যের শেষ দু’লাইন, “এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।” জয় বাংলা। উপস্থিত জনতার করতালির মাঝেই ভীড় ঠেলে নিজের সিএনজি অটোরিকশায় বসলেন রফিকুল।

কয়েকজন স্থানীয় অটোরিক্সা চালকের সাথে কথা বলে জানা গেল, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এক ব্যতিক্রমি ফেরিওয়ালা এই রফিকুল। জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা নিয়ে ঘোরেন পথে পথে, যাত্রীদের শোনান ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণ।

উৎসুক জনতার ভীড় কমলে কথা হল রফিকুলের সাথে। জানালেন, ঈশ্বরদী উপজেলার ছলিমপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামে বাড়ি তার। বাবা মারা যাওয়ায় কিশোর বয়সে ধরেছেন সংসারের হাল। দারিদ্রের সঙ্গে লড়াইয়ে স্কুলের গণ্ডি পেরোতেই বন্ধ হয়েছে লেখাপড়া। জীবিকার প্রয়োজনে করেছেন মাটি কাটার কাজ, দিনমজুরি। বেসরকারি সংস্থার ঋণে কেনা, অটোরিকশার তিন চাকায় ঘোরে জীবনের চাকা। ছেলেবেলায় গ্রামের বাজারে মাইকে বাজানো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণ দারূণভাবে নাড়া দেয় তাকে। বঙ্গবন্ধুর অন্ধভক্ত হয়ে শুরু করেন তার অনুকরণ। দৃপ্ত উচ্চারণে, দৃঢ়কণ্ঠে জাতির পিতাকে অনুকরণে রফিকুলের প্রচেষ্টায় জাগে বিস্ময়, মুগ্ধতা। এ যেন সাধারণের মাঝে বেঁচে থাকা অসাধারণ বঙ্গবন্ধু।

রফিকুল জানালেন, নিয়মিত তিনি টেলিভিশনের খবর দেখেন, পড়েন খবরের কাগজ। সেসব মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা থেকে জানার চেষ্টা করেন জাতির জনকের গৌরবগাঁথা, জানান নিজের সন্তান ও প্রতিবেশীদের। উচ্চকণ্ঠে সাতই মার্চের ভাষণের অনুশীলনও করেন। এসব কাজে প্রতিবেশীরা একসময় পাগল ভাবলেও, এখন তারাই দলবেঁধে আসেন রফিকুলের কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে।

রফিকুলের চাচা ইদ্রিস বিশ্বাস বলেন, ছোটবেলায় যখন আমাদের সাথে মাটি কাটতে যেত, তখন কাজের ফাঁকে উঁচু ঢিবিতে উঠে বঙ্গবন্ধুর মত করে ভাষণ দিত রফিকুল। আমরাও মজা পেতাম। তখন, বিষয়টিকে আমরা ছেলেমানুষি ভাবলেও, এখন বুঝি বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার ভালবাসা কতটা। দিনে দিনে সে নিয়ত চেষ্টায় বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ রপ্ত করেছে। এখন নানা জায়গা থেকে মানুষ তাঁর কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে আসে।

রফিকুলের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া কন্যা রুমী ইসলাম বলেন, আব্বু যখন জোরে জোরে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অনুশীলন করতেন, তখন প্রতিবেশীদের অনেকেই পাগল বলে হাসাহাসি করত। আব্বু কারো কথায় কর্ণপাত করেননি। এখন দূর দুরান্ত থেকে মানুষ আব্বুকে দেখতে আসে। আমাদের খুবই গর্ব হয়।

অটোরিকশার যাত্রীদেরও সাতই মার্চের ভাষণ শোনান রফিকুল। বলেন বঙ্গবন্ধুর নীতি, আদর্শ আর আত্মত্যাগের কথা। মুগ্ধ যাত্রীরা বার বার শুনতে আসেন তার কন্ঠে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। সে আবদার রাখতে সহকর্মীদের সাথে নিয়ে অটোরিকশা স্ট্যান্ডেই ভাষণ শোনান তিনি। দাশুড়িয়া অটোরিক্সা স্ট্যান্ডের মাস্টার পিয়াস হাসান বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেকেই বড় বড় কথা বলেন। কিন্তু রফিকুলের মত কয়জন বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পেরেছে। একজন সাধারণ সিএনজি অটোরিক্সা চালক রফিকুলের এ কৃতিত্বে আমরা সত্যিই গর্বিত। রফিকুলের এ কৃতিত্বকে সুযোগ সন্ধানীরা বাণিজ্যিক, দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে প্রলুব্ধ করলেও, রাজি হননি। আপন মনে গেয়ে চলেছেন বঙ্গবন্ধুর জয়গান।

কি আছে এই সাতই মার্চের ভাষণে, কেনই বা তা মানুষকে শোনান রফিকুল? জানতে চাইলে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ একটা কবিতার মত। শুনলেই গা শিউরে ওঠে। কতটা শক্তি থাকলে একটা ভাষণ সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, মানুষ অকাতরে জীবন দিতে পারে তারই প্রমাণ এই ভাষণ। বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করলে বাংলাদেশকে অস্বীকার করা হয়। তাই আমি বঙ্গবন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই এ ভাষণ আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছি।

স্বাধীনতা দিবস, শোক দিবসসহ জাতীয় দিবসগুলোতে আশেপাশের গ্রাম থেকে ভাষণ শোনানোর আমন্ত্রণ আসে রফিকুলের। নিজের জমানো টাকায় কেনা সফেদ পাঞ্জাবি-পাজামা আর মুজিব কোট পরে ভাষণ দিতে যান। ভাষণ শুনে মানুষের করতালি আর ভালবাসায় হন সম্মানিত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে আজীবন কাজ করার প্রত্যাশা তার। রফিকুলের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বিশিষ্ট জনেরাও।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর হুমায়ুন কবির বলেন, পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে ইতিহাস থেকে শেখ মুজিবের নাম মুছে ফেলতে চক্রান্ত কম হয়নি। এমনও সময় গেছে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করলেই নির্যাতিত হতে হয়েছে। তবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন এক মহামানব,যার স্থান হাজারো রফিকুলের হৃদয়ে, সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে আলাদা করার সাধ্যি আছে কার।

‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি…’ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত অংশুমান রায়ের গানটি, এই বাংলায় বারবার বাস্তব হয়ে আসে। তারই প্রতিচ্ছবি যেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের এক ফেরিওয়ালা ঈশ্বরদীর দরিদ্র অটোরিকশা চালক রফিকুল।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666