ঢাকা সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৫২ অপরাহ্ন

ঈশ্বরদীর পদ্মা চরে সবুজ বিপ্লব

শেখ মেহেদী হাসান
  • প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ জুন, ২০১৯
ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়া ইউনিয়নে পদ্মার চরে বাদাম চাষ।

ঈশ্বরদীর পদ্মা নদীর কোলঘেঁষে সাঁড়া ও লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়ন। ডিসেম্বর মাস। পদ্মা নদীতে কমে পানি। জেগে ওঠে বিধৌত পলিমাটির চর। বর্ষা মৌসুম শুরু হয় জুনের মাঝামাঝি। বীজ বপন করে ফসল ঘরে তুলতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ মাস। দীর্ঘদিন ধরে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আসছেন দুই ইউনিয়নের পদ্মাপাড়ের কৃষকরা। এবারও রোপন করা হয়েছিল চিনামাদাম। এখন মাঠের পর মাঠ শুধু চিনাবাদামের সবুজ ক্ষেত। দেখে মনে হয় শিল্পীর রঙতুলিতে চরে সবুজের ঢেউ লেগেছে। ঘটেছে সবুজ ক্ষেতের নীরব বিপ্লব। এখন চিনামাদামগুলো ঘরে তোলার পালা। বাদাম পোক্ত হয়ে গেছে। বর্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই পদ্মা নদীতে বাড়তে শুরু করবে পানি। তাই এখন এই দুই ইউনিয়নের চিনাবাদাম চাষিরা ব্যস্ত বাদাম তোলার কাজে। বাদামসহ সবুজ গাছগুলো টেনে উপড়ে তোলার কাজে ব্যস্ত পুরুষ শ্রমিকরা। আর সেই গাছ থেকে বাদাম ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাড়ির বধূ, শিশু ও কিশোরীরা। গত শুক্র, শনি ও রবিবার সাঁড়া ও লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের পদ্মা পাড়ের এলাকা ও চরে ঘুরে এসব দৃশ্য চোখে পড়ে।

চিনাবাদাম চাষে খরচ কম। তেমন একটা সার, কীটনাশক ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে না। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাদামের রোগ-বালাই কম থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে। তাই কৃষকদের মুখে হাসির ঝিলিক। আর এই বাদামগুলো সংরক্ষণের সুব্যবস্থা ঈশ্বরদীতে নেই। তাই দ্রুত বাদামগুলো শুকিয়ে বস্তায় ধরে ঘরে রাখা হয়। তারপর সেগুলো লালপুর, নাটোর, পাবনা ও রাজশাহীতে নিয়ে গিয়ে আড়তে বিক্রয় করা হয়।

উপজেলার পাকশী রেলওয়ে ডিগ্রি কলেজের অনার্সের শিক্ষক চিনাবাদাম চাষি গোলাম সরোয়ার সোহাগ জানান, তিনি ছাত্রজীবন থেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় প্রতিবছরই তিনি অন্যান্য ফসলের সঙ্গে বাদাম চাষ করেন। এখন বাদাম তোলার কাজ চলছে। পুরুষ শ্রমিকরা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দিন হাজিরায় কাজ করছেন। আর নারী ও কিশোরীরা ২৫০ টাকা চুক্তিতে প্রতিমণ বাদাম ছাড়ানো কাজ করছেন। ফলন খুবই ভালো হয়েছে। দামও তুলনামূলক ভালো আছে। তাই এবার লোকসান হবে না। তবে দামটা আরেকটু বাড়লে খুবই ভালো হতো।

মাজেদা বেগম ও জোসনা বেগম, সঙ্গে শিশু ও কিশোরীদের নিয়ে মাঠেই বাদাম ছাড়ানোর কাজ করছেন। তারা জানান, প্রতিমণ বাদাম গাছ থেকে ছাড়ালে চুক্তি হিসেবে ২৫০ টাকা পান। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ কেজির বেশি বাদাম ছাড়ানো যায় না।

শিশু শায়লা ও কিশোরী শাপলা রোকসানা জানান, তারা স্কুলে লেখা-পড়া করে। স্কুলে যাওয়ার আগে এবং স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে তারা বাদাম ছাড়ানোর কাজ করে। কোনো কোনো সময় তারা মাঠ থেকে বাড়ির সীমানায় বাদামগাছ নিয়ে এসে বাদাম ছাড়িয়ে থাকে। এই টাকা দিয়ে তারা সংসারের প্রয়োজনসহ নিজেদের লেখা-পড়া ও জামা-কাপড় বানিয়ে থাকে। তারা প্রতিবছরের মৌসুমে মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে এই কাজ করে।

বাদাম শুকিয়ে ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত বয়োবৃদ্ধ কৃষক রহমদ্দিন শেখ (৬৫)। তিনি এই এলাকার প্রান্তিক কৃষক। নিজের জমি ছাড়াও পরের জমি বার্ষিক খাজনা নিয়ে চিনাবাদাম চাষ করেন। এবার ৬ বিঘা জমিতে বাদাম চাষ করেছেন। বাদামগুলো পোক্ত হয়ে গেছে। কয়েকদিন পরই নদীতে বর্ষা মৌসুম উপলক্ষে পানি বাড়তে শুরু করবে। তাই দ্রুত বাদামগুলো তুলে নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, প্রতিবিঘা জমিতে এবার কমপক্ষে ৪০ থেকে ৪৫ মণ হারে বাদাম পাবেন বলে আশা করছেন। খুরচা বাজারে প্রতিমণ ২৪০০ থেকে ২৮০০ টাকা দরে বিক্রয় হয়। কিন্তু আড়তে ২০০০ থেকে ২৪০০ টাকা দরে বিক্রয় হয়।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল লতিফ জানান, এবার পদ্মানদীর চরে মোট ১৬০ হেক্টর জমিতে চিনাবাদাম চাষ হয়েছে। যা চাষের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে সাঁড়া ইউনিয়নের পদ্মা নদীর চরে ১০০ হেক্টর। আর লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নে ৬০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ হয়েছে। ফলনও খুব ভালো হয়েছে। তিনি আরো জানান, বাদামে সার ও কীটনাশক ব্যবহার নেই বললেই চলে। কোনো কোনো সময় সামান্য পরিমাণ টিএসপি এবং এমওপি সার প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে। ৫ মাসের এই রবি শস্য খুবই লাভজনক। এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে কোনো ব্যবস্থা নেই। আর ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকরা তেমন একটা লাভের মুখ দেখেন না বলে দুঃখ প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
%d bloggers like this: