ঢাকা শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৩৮ পূর্বাহ্ন

পাবনা- ৪ উপনির্বাচন: মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ আ. লীগের দেড় ডজন নেতার

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২০
ছবি: ঈশ্বরদীনিউজটুয়েন্টিফোর.নেট গ্রাফিক্স টিম

নির্বাচনের তফসীল ঘোষনার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, বাড়ছে ততই নির্বাচনী আলোচনা। সন্ধ্যা নামলেই জমে ওঠে চায়ের টেবিল। আলোচনা হয় প্রার্থী নিয়ে, নির্বাচন নিয়ে। প্রবীণ রাজনীতিবিদ সাবেক ভূমিমন্ত্রী প্রয়াত শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর মৃত্যুতে শূন্য হওয়া পাবনা-৪ আসনটিতে নৌকার হাল ধরতে ইতিমধ্যে দেড় ডজন খানেক মনোনয়ন প্রত্যাশী আওয়ামী লীগের নেতারা লবিং শুরু করেছেন। কেউ কেউ প্রার্থিতা জানান দিতে পোস্টার ও বিলবোর্ড সাঁটিয়েছেন নির্বাচনী এলাকায়।

পাবনা জেলার গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকার দলীয় নেতা-কর্মীদের চাওয়া এই আসনটি ত্যাগী রাজনীতিবিদদের হাতেই থাকুক। দলের অনেক দুঃসময়ের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা রয়েছেন তাদের হাতেই তুলে দেওয়া হোক নৌকার টিকিট। শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর আসনটি তার মতো একজন পরীক্ষিত ও ত্যাগী রাজনীতিক হাল ধরুক এমনটাই চান নেতা-কর্মীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেতে পাবনা জেলার শীর্ষ নেতাসহ বেশ কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়ন পেতে বেশ তৎপর। এ লক্ষ্যে তারা এলাকায় পোস্টার সাঁটানোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রচারণা চালাচ্ছেন। রাজনীতির মাঠে না থাকলেও হঠাৎ কর্মী-সমর্থক বানিয়ে নিজেদের পক্ষে অনেক কিছু লিখছেন। তাদের এমন প্রচারণায় দলের নেতা-কর্মীরাও পড়েছেন ভাবনায়।

এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ডিলু পরপর পাঁচবার নির্বাচিত সাংসদ ছিলেন। চলতি বছরের ০২ এপ্রিল ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর নৌকার হাল ধরছেন কে সে আলোচনা এখন সর্বত্র।

জাতীয় সংসদের ৭১ পাবনা-৪ ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া দুইটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬২ হাজার ৪৩৮ জন তাঁর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮২ হাজার ৬০৬ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৩২ জন।

এ আসনে নৌকার হাল ধরতে প্রয়াত সংসদ সদস্য ডিলুর ছেলে ও ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য গালিবুর রহমান শরীফ, প্রয়াতের স্ত্রী উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কামরুন নাহার শরীফ, তাঁর মেয়ে জেলা আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মাহজেবিন শিরিন পিয়া ও তাঁর জামাই পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মেয়র আবুল কালাম আজাদ মিন্টু মাঠে কাজ করছেন।

অন্যদিকে সাবেক ডিজিএফআই প্রধান ও পাবনা জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) এএসএম নজরুল ইসলাম রবি, জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল, পাবনা জেলা আওয়ামীলীগের উপদপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার সৈয়দ আলী জিরু, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম লিটন, সদ্য আওয়ামী লীগে ফেরা পাবনা পৌরসভার মেয়র কামরুল হাসান মিন্টু, আটঘরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মেয়র শহিদুল ইসলাম রতন, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং সাবেক সংসদ সদস্য পাঞ্জাব আলী বিশ্বাস, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক বশির আহমেদ বকুল মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন।

এ ছাড়াও নৌকার টিকিট পেতে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে রয়েছেন, জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান বিশ্বাস, উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নায়েব আলী বিশ্বাস, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নেতা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি রবিউল আলম বুদু, পৌর আওয়ামীলীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মিজানুর রহমান স্বপন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোহাম্মদ রশিদুল্লাহ, মৎস্যজীবী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুল আলিম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী ড. মুসলিমা জাহান ময়না ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য জালাল উদ্দিন তুহিন।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দলাদলিকে কাজে লাগাচ্ছে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম সরদারও।

তবে মনোনয়নের দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি মঞ্জুর রহমান বিশ্বাস ও জাতীয় পার্টির সাবেক জেলা সভাপতি হায়দার আলী। অপরদিকে লস অ্যাঞ্জেলেস ক্যালিফোর্নিয়ার প্রবাসী রকি প্রামাণিক রফিকুল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ঈশ্বরদী উপজেলা কয়েক নেতা গেল কয়েক মাস আগে থেকে মাঠে নেমে পড়েছেন, নানাভাবে প্রচার–প্রচারণা চালাচ্ছেন। গণভবনে গিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে মনোনয়নপ্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ আছে অনেক নেতার। সরাসরি দল করছেন না—এমন অনেকে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।

মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কাহন
রেজাউল রহিম লাল বলেন, তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুত। এখন প্রধানমন্ত্রী যদি মনোনয়ন দেন, তাহলে এটা বাস্তবায়ন হবে। যদিও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কোনো আলাপ হয়েছে কিনা, সেই বিষয়ে কিছু বলেননি এই নেতা। বলেছেন, ‘সময় হলে সব জানানো হবে’।

নজরুল ইসলাম রবি বলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের কাছে পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য পদে মনোনয়নের জন্য আবেদন করবো। এ আসনে তাকে মনোনয়ন দিলে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসনটি তিনি শেখ হাসিনাকে উপহার দেবেন।

নুরুজ্জামান বিশ্বাস বলেন, ‘দল চাইলে প্রার্থী হব, না হলে দল যাকে মনোনয়ন দিবে অতীতের মত তাঁর পক্ষে কাজ করবো’।

গালিবুর রহমান শরীফ বলেন, ‘তিনি বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছেন। ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়াবাসীর সঙ্গে কথা বলছেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলে ভোটে অংশ নিতে প্রস্তুত তিনি।’

নায়েব আলী বিশ্বাস বলেন, ‘দলের জন্য জীবন-যৌবন বিসর্জন দিয়েছি। জেল জুলুম খেটেছি। তাই এবার মনোনয়ন চাইব।’

ব্যারিস্টার সৈয়দ আলী জিরু বলেন, ‘ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া একটি চরম সম্ভাবনাময় এলাকা। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে যোগ্য নেতৃত্ব ও লোকের অভাবে সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। এখানে স্বচ্ছ লোকের অভাব।’

রফিকুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘মনোনয়ন পেলে প্রধানমন্ত্রীর ভিশন-২১ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিরলস কাজ করে যাব। তাছাড়া নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বই পারে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে।’

রবিউল আলম বুদু বলেন, আমি ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া (পাবনা-৪) আসনে আওয়ামী লীগের কাছে মনোনয়ন চাইবো। সমাজের পরিবর্তন করতে হলে নিজেকে সৎ, নিষ্ঠাবান ও ত্যাগী হতে হবে।

মিজানুর রহমান স্বপন বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। তাই আমারও স্বপ্ন ঈশ্বরদীতে মানবিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আমাকে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয় এবং যদি নির্বাচিত হই তাহলে অসৎ কর্মকান্ড, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদকের ছড়াছড়ি ঈশ্বরদীতে থাকবে না। এ জন্য তিনি তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসার আহবান জানান।

মাহজেবিন শিরিন পিয়া বলেন, আজ বাবা নেই। তিনি ঈশ্বরদী-আটঘরিয়াই ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছেন। তিনি ঈশ্বরদীকে জেলা করার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি রেলগেটে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের চেষ্টাও করেছিলেন। আল্লাহ তাকে আর কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখলে তিনি হয়তো তাঁর স্বপ্নগুলো পূরণ করে যেতে পারতেন। আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছেন। আমি তাঁর সন্তান হিসেবে তাঁর স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করতে চাই।

সাবেক সংসদ সদস্য পাঞ্জাব আলী বিশ্বাস বলেন, ‘বিগত নির্বাচনে নেতাকর্মী ও হাজার হাজার মানুষ আমাকে প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। ব্যাংকে এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা ঋণ ছিল। সঙ্গে থাকা নেতাকর্মী ও জনগণ চাঁদা তুলে ঋণ পরিশোধ করেছিলেন। কিন্তু সেই সময় দুর্নীতিবাজদের কাছে মনোনয়নযুদ্ধে আমি হেরে গিয়েছিলাম।’

হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ‘ভালো কাজের জন্য ভালো পরিবেশ দরকার। একটি পক্ষকে দমনপীড়ন করে একতরফা নির্বাচন করলে দেশের মঙ্গল হবে না। দলীয় মনোনয়ন পেলে জনগণ আমাকে অতীতে যেভাবে সমর্থন করেছে, তাতে আমি নিশ্চিত ধানের শীষের বিজয় কেউ রুখতে পারবে না। আমার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নেই। সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যাব।’

হায়দার আলী বলেন, অপরাজনীতির হাত থেকে রেহাই পেতে পল্লীবন্ধু প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আদর্শের জাতীয় পার্টির শাসন দেখতে চায় জনগণ। তিনি বলেন, আশা করছি, আগামী উপনির্বাচনে ভোটে আমি বিজয়ী হব।

পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা শামসুর রহমান শরিফ ডিলু এমপির মৃত্যুজনিত কারণে পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) আসনটিকে শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। ১৩ এপ্রিল দুপুর ১২টায় জাতীয় সংসদের জেষ্ঠ্য সচিব ড. জাফর আহমেদ খান স্বাক্ষরিক এক প্রজ্ঞাপনে আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। সবশেষে ২০ জুলাই উপনির্বাচনের তফসিল আগস্টের শেষ সপ্তাহে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব মো. আলমগীর।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
%d bloggers like this: