ঢাকা মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ১১:২০ অপরাহ্ন

কৃষিতেই কোটিপতি নুরুন্নাহার, উদ্বুদ্ধ করছেন অন্য নারীদের

নিজস্ব প্রতিবেদন
  • প্রকাশিত: রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২০
নারী উদ্যোক্তা নুরুন্নাহার। ছবি: ঈশ্বরদীনিউজটুয়েন্টিফোর

ঈশ্বরদী উপজেলার ছলিমপুর ইউনিয়নের বক্তারপুর গ্রামের বাসিন্দা নুরুন্নাহার। গ্রাম্য গৃহবধূ হয়েও তিনি নিবিড় সবজি, ফলমূল, পোল্ট্রি ও গাভীর খামার করে এলাকার অন্য নারীদের কৃষি কাজে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এছাড়া তিনি একজন সমাজ উন্নয়নকর্মী ও নারী উদ্যোক্তার দায়িত্ব পালন করছেন। জয়বাংলা নারী উন্নয়ন মহিলা সমবায় সমিতি ও এনসিডিপি গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সভানেত্রী নারী উদ্যোক্তা নুরুন্নাহার এক হাজারের বেশি নারীদের সংগঠিত করে তাদের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

নুরুন্নাহার জানান, স্বামী কাজে বেরিয়ে গেলে একদম অলস বসে থাকা তার ভালো লাগত না। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান দেখে তারও ইচ্ছে জাগে বসতবাড়ির আশপাশে শাক-সবজি ও ফলমূলের বাগান গড়ে তোলার। এরপর আর থেমে থাকেনি নুরুন্নাহার। লালশাক, পুঁইশাক, বেগুন, গোল আলু, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচামরিচ, যা কিছু তিনি বাড়ির আঙিনায় চাষ করেন তা দিয়েই সারা বছরের সবজির চাহিদা মিটে যায়। এমনকি বাড়তি কিছু আয়ও হয়। প্রথম প্রথম স্বামী তার কর্মকাণ্ডে কিছুটা বিরক্ত হতেন। ২০০৫ সালে ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান, জাকির হোসেন ও আব্দুর রশিদ নুরুন্নাহারের এলাকায় ব্র্যাক এনসিডিপির মহিলা গ্রাম কমিটি গঠনের পর তাকে দায়িত্ব দিয়ে যান। এতে করে তার স্বামীর আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বসতবাড়ির আঙিনায় এবং বাড়ি সংলগ্ন ৫ বিঘা জমিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, গাজর ইত্যাদি ফসলের আবাদ করে আশাতীত লাভবান হন। পরের বছর ৩১ আগস্ট ঋণ পরিশোধ করে দ্বিতীয়বারের মতো ২০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন।

নুরুন্নাহার এলাকার কৃষির চেহারা পাল্টে দিয়েছে। নিজের তৈরি কম্পোস্ট সার দিয়ে নিজেই সবজির চাষ শুরু করেছেন।

এ অবস্থায় তিনি জানতে পারেন বড়ইচারা দক্ষিণপাড়ায় ছিদ্দিকুর রহমান ময়েজের কুলচাষ প্রকল্পের কথা। ময়েজের কাছ থেকে চারা কিনে এনে নুরুন্নাহার ১৭৫টি গাছের একটি কুল বাগান গড়ে তোলেন। প্রথম বছর কুল বিক্রি করে তিনি ২৫ হাজার টাকা আয় করেন। এছাড়া উন্নত জাতের পেয়ারার ৪০টি গাছও লাগান আঙিনায়। বর্তমানে তার খামারে ১০০টি গরু, ৪ হাজার সোনালী মুরগি, ২ বিঘা ড্রাগন, ৭ বিঘা পেয়ারা, ৬ বিঘা লিচু, ৫ বিঘা পেঁপে, ২ বিঘা কলা, ৪ বিঘা লাউ, ৪ বিঘা ফুলকপি, ৪ বিঘা পেঁয়াজ, ৩ বিঘা রসুন, ১ বিঘা টমেটো, ৩ বিঘা বেগুন, ৩ বিঘা মটর, ২ বিঘা গম, ৪ বিঘা আলু, ২০ বিঘা মশুর চাষ করছেন।

নুরুন্নাহারের স্বামী রবিউল ইসলাম বিশ্বাস একজন ব্যবসায়ী। জয়নগরের চালকল মোকামের একটি মিলে ধান চালের ব্যবসা করেন। এরপর নুরুন্নাহারের জয়-জয়কার ছড়িয়ে পড়ে গোটা পাবনা জেলায়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নুরুন্নাহারের কাছে কৃষি কাজের পরামর্শ নিতে ছুটে আসেন। নুরুন্নাহার তার গ্রামের ২০০ নারীকে হাতে-কলমে কৃষি কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কৃষক হিসেবে গড়ে তোলেন।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রওশন জামাল বলেন, নুরুন্নাহার বেগম পরিশ্রম, ধৈর্য, অধ্যবসায়, সাহস ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে সংগ্রাম করে সাহসিকতার মধ্য দিয়ে কৃষি খামার করে তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা ও খামারি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। দেশের সব নারী কৃষককে ডিঙিয়ে ২০১০ সালে নুরুন্নাহার সিটি গ্রুপ জাতীয় পুরস্কার পেয়ে যান।

২০১১ সালে দেশের সেরা নারী কৃষক হিসেবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি ব্রোঞ্জ পদক ও ২০১৬ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি স্বর্ণপদক ও ২০১৭ সালে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে মাছরাঙ্গা অ্যাওয়ার্ড পেয়ে তিনি দেশের মানুষকে তাক লাগিয়ে দেন। পরিশ্রম মানুষকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যায় তার বাস্তব প্রমাণ হলো নুরুন্নাহার কৃষি খামারের স্বত্বাধিকারী কৃষাণী নুরুন্নাহার বেগম। কঠোর পরিশ্রম করে নুরুন্নাহার বেগম একজন মডেল খামারি হিসেবে ইতোমধ্যে ঈশ্বরদীতে পরিচিতি লাভ করেছেন।

নুরুন্নাহার বেগমের সফলতা দেখে ছলিমপুর ইউনিয়নের বক্তারপুর গ্রামের নারীরাও রীতিমতো প্রতিযোগিতামূলক কৃষি কাজে এগিয়ে এসেছেন। পরিশ্রম, ধৈর্য, অধ্যবসায়, সাহস ও মেধাকে কাজে লাগাতে পারলে নুরুন্নাহার বেগমের মতো সবাই একসময় ক্রমান্বয়ে উপরে উঠতে থাকবে।

নুরুন্নাহার কথা বলেছেন ঈশ্বরদীনিউজটুয়েন্টিফোর.নেট- এর প্রতিবেদক ইয়াছিন আরাফাতের সঙ্গে।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
%d bloggers like this: