ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ১২:০৪ অপরাহ্ন

বাজারে চীনা পণ্যের দাম বাড়ছে

রাজীব আহমেদ, ঢাকা
  • প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
চীন থেকে আমদানি বিঘ্নিত

পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডে যমুনা ট্রেডার্সে মাঝারি আকারের একটি ড্রিল মেশিনের দাম ছিল ৩৬ হাজার টাকার মধ্যে। ১৫ দিনের ব্যবধানে যন্ত্রটির দাম বেড়েছে ছয় হাজার টাকা।

যমুনা ট্রেডার্সের মালিক মো. শহিদুল ইসলাম বললেন, শুধু ড্রিল মেশিন নয়, চীন থেকে আসা সব যন্ত্র ও খুচরা যন্ত্রাংশের দামই বাড়তি। এর কারণ, দেশটি থেকে আমদানি প্রায় বন্ধ। কবে আবার তা স্বাভাবিক হবে, তা কারও জানা নেই।

চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে গত ডিসেম্বর মাসে নতুন ধরনের করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশে শুরুতেই বেড়ে যায় চীনা রসুন, আদা ও দারুচিনির দাম। এবার বাড়ল শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, বিভিন্ন শিল্পপণ্য, নিত্যব্যবহার্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম। বিশেষ করে পুরান ঢাকার পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্রগুলোতে ব্যবসায়ীরা চিন্তিত। কারণ, তাদের কাছে যে মজুত আছে, তা শেষের পথে। নতুন করে আমদানির চালান কবে আসবে, তা অনিশ্চিত।

এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে বাংলাদেশে শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্যের বড় উৎস চীন। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৫ হাজার ৬০৬ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার ২৫ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। অবশ্য রপ্তানিতে চীনের বাজার বাংলাদেশের জন্য ততটা বড় নয়। সর্বশেষ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ২ শতাংশ এসেছে চীন থেকে।

পুরান ঢাকার কয়েকটি ব্যবসাকেন্দ্র ঘুরে গতকাল রোববার চীনা পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র দেখা যায়। তার মধ্যে নবাবপুর রোড একটি। পুরো দেশের শিল্পকারখানার খুচরা যন্ত্রাংশের বড় জোগান যায় নবাবপুর রোড থেকে। সেখানকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, খুচরা যন্ত্রাংশের সিংহভাগের উৎস চীন। এর পাশাপাশি তাইওয়ান, কোরিয়া, জাপান এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ থেকে যন্ত্রাংশ আসে। পণ্যের মধ্যে হাজার হাজার রকম ও ধরন রয়েছে। এর মধ্যে চীন থেকে যা আসে, তার বেশির ভাগের দাম বাড়তি।

দুটি উদাহরণ দেওয়া যাক। স্টেইনলেস স্টিলের একটি ইউনিয়ন ফিটিংয়ের দাম গত সপ্তাহে ছিল ১২০ টাকার মধ্যে। গতকাল তা ১৪০ টাকায় ওঠে। মূল্যবৃদ্ধির হার ১৬ শতাংশ। আধা মিলিমিটার পূরত্বের একটি মাঝারি আকারের অ্যালুমিনিয়াম শিটের দাম গত সপ্তাহে ছিল ১৫৩ টাকা, সেটা এখন ১৬২ টাকা। মূল্যবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের মতো।

নবাবপুরের বহু আমদানিকারকের মধ্যে একজন দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, চীনে কারখানা বন্ধ। চীন সরকার সোমবার (আজ) জানাবে যে কবে কারখানা খুলবে। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি ঋণপত্র খুলেছি। সেখানে চীনারা লিখেছে, কারখানা খোলার ৪০ দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করবে তারা।’

দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, নওয়াবপুরে আমদানিকারকের সংখ্যা অনেক। তাঁরা প্রচুর পণ্য আমদানি করে রাখেন। তাই এখনো আমদানি বন্ধের খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। আগামী মাসে বোঝা যাবে, পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়।

যমুনা ট্রেডার্সের মালিক শহিদুল ইসলামের সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম, তখন উপস্থিত ছিলেন মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা ক্রেতা আসিফ রাব্বি, যিনি মদিনা ট্রেডার্স নামের একটি খুচরা যন্ত্রাংশের দোকানের মালিক। আসিফ রাব্বি বলেন, ‘যা কিছু কিনতে এসেছি, বেশির ভাগের দামই বাড়তি। বাড়তি দামে কিনে আমাকে বাড়তি দামেই বেচতে হবে। এতে খরচ বাড়বে ছোট কারখানা ও মিস্ত্রিদের।’

রাজধানীর গুলিস্তান থেকে নবাবপুর রোডে ঢুকতেই দুই পাশে বৈদ্যুতিক পণ্যের বাজার। কয়েক শ দোকানের মধ্যে একটি মেসার্স নিজাম এন্টারপ্রাইজ। দোকানের বিক্রেতা বললেন, বৈদ্যুতিক সকেট, হোল্ডার, সুইচ ইত্যাদি পণ্যের ৭০ শতাংশ আসে চীন থেকে। আমদানি বিঘ্নিত হওয়ায় দাম কিছুটা বেড়েছে।

শিল্পের অন্যতম একটি কাঁচামাল রাসায়নিক। পুরান ঢাকায় এই রাসায়নিকের দামও বেড়েছে। যেমন ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের প্রতি টনের দাম ছিল ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকার মধ্যে। এখন সেটা ১৫ হাজার টাকায় উঠেছে। এ তথ্য জানিয়ে পিভিসি পাইপ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশেন সভাপতি মো. আবুল খায়ের বলেন, চীন থেকে অানা মোম, অ্যাসিডসহ আরও কিছু রাসায়নিকের দাম বাড়তি। তিনি বলেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে।

একইভাবে হাজারীবাগকেন্দ্রিক চামড়া খাতের রাসায়নিক ব্যবসায়ী ও ট্যানারির মালিকেরা কিছু কিছু রাসায়নিকের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলছেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, চামড়া প্রক্রিয়াকরণের ৩০ শতাংশ রাসায়নিক আসে চীন থেকে। বাকিটা ইউরোপ থেকে। কিছু কিছু চীনা রাসায়নিকের দাম বেশ বাড়তি। তিনি বলেন, এভাবে আর ১৫ দিন চললে রাসায়নিকের সংকট তৈরি হবে।

রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের জন্যও দুঃসংবাদ। কারওয়ান বাজারের হাজি মিজান স্টোরের বিক্রেতা জাকির হোসেন বলেন, চীনা প্রক্রিয়াজাত মাশরুম, বেবি কর্ন, সুইট কর্ন, অয়েস্টার সস, ফয়েল পেপার, র‌্যাপিং পেপার ইত্যাদির দাম বেড়েছে। যেমন ২০০ গ্রামের এক কৌটা মাশরুমের দাম ছিল ৬৫ টাকার মধ্যে। এখন সেটা ৮০ টাকা।

চীনা পণ্যের দাম বাড়ায় বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন দেশের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ও সেবা খাতের উদ্যোক্তারা। কারণ, তাঁরা নিজেরা আমদানি না করে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের কাছ থেকে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ কিনে পণ্য উৎপাদন করেন। আবার তাঁদের মুনাফার হারও খুব কম। কাঁচামালের দাম বাড়লে তা সামাল দেওয়ার উপায় থাকে না।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেখতে হবে চীনের সমস্যাটি স্বল্প মেয়াদে মিটে যাবে, নাকি মধ্যমেয়াদে গড়াবে। মধ্যমেয়াদি হলে চীনের বিকল্প উৎস দেশ খোঁজা দরকার। বাংলাদেশের মতো আমদানিতে চীননির্ভর ভারত ও ভিয়েতনাম কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, চীনের পরিস্থিতি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণকে তথ্য জানাতে পারে। যাতে অযথা আতঙ্ক তৈরি না হয়।

শেয়ার করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩ - ২০২১
 
themebaishwardin3435666
%d bloggers like this: